বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর

সুবর্ণচরের আতংক 'মেম্বার পার্টি' আর কিছু চাপা পড়া গল্প



সুবর্ণচরের আতংক 'মেম্বার পার্টি' আর কিছু চাপা পড়া গল্প

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে স্বঘোষিত 'মেম্বার' পদবীধারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে এর নেতৃত্বে রয়েছে নুর মোহাম্মদ ভুট্টু ওরফে ভুট্টু মেম্বার। যাদের মূল কাজ জমি দখল করা। এই মেম্বার পার্টির কাছে হয় ব্রিটিশ আমলের নয়তো পাকিস্তান আমলের টিপসই দলিল থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত কোন দলিল, খতিয়ান, দাখিলা কিংবা নামজারির মত কাগজপত্র কিছুই থাকে না। ওই টিপসই দলিলকে পুজি করে মামলাবাজির মাধ্যমে তিন পুরুষ যাবৎ বসবাসরত সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করছে এই চক্র। যার মূল টার্গেট হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। এমনি কিছু ভিক্টিম পরিবারের কথা এখানে তুলে ধরা হলো।

২৪ সালে ডিসেম্বরের এক বিকেলে হিন্দু পরিষদ নামক একটি সংগঠন অভিযোগকারী এক পরিবারের অবস্থা দেখতে যায়। ঘটনাস্থলে দেখা হয় জ্যোতি রাণী বৈষ্ণবী নামক সংসার ত্যাগী এক নারীর সঙ্গে। জরাজীর্ণ ছোট্ট টিনের ঘরে একাকি বসবাস ষাটোর্ধ এই নারীর। শীতের ঠান্ডা হাওয়া ভাঙা বেড়ার একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশে বার হচ্ছে। নাহ লেপ কম্বল দিয়ে এই ঠান্ডাতো আটকানো সম্ভব নাহ। ঘর মেরামত করছেন না কেনো? জিজ্ঞেস করায় মিললো ভিন্নধর্মী উত্তর। ঘর ঠিক করতে বাড়ির কিছু গাছ কেটে বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু সেই বিক্রি করা গাছের টাকা হাতে পাওয়ার আগেই সুমন মেম্বার নামক কোনো এক ব্যক্তি গাছগুলো তুলে নিয়ে গেছে! সুমন মেম্বার কোন ইউনিয়নের মেম্বার? জিজ্ঞেস করায় উত্তর আসলো, 'সবাই ডাকে মেম্বার আমরাও ডাকি মেম্বার, কোন ইউনিয়নের মেম্বার সেইটা জানিনা।' ভিক্ষাবৃত্তি করে বৈরাগ্যের জীবনযাপন করা সংসার ত্যাগী এমন একজন বৃদ্ধার ধনেও কারোর লোভ থাকতে পারে ভাবা যায় না। আচ্ছা আমরা মিস্ত্রি ঠিক করে ঘর করে দিবো? উত্তর দিলো মিস্ত্রি এলে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়, কারোর ক্ষমতা নেই উনার ঘর ঠিক করে দেয়ার। এরপরের অভিযোগ আরো গুরুতর, এখানে বসবাস করতে তার কাছে সাত লক্ষ টাকা চাওয়া হয়েছে, কারণ সরকার পতনেরপর থেকে তিনি আর জায়গার মালিক নাই! অথচ উনার দলিল বলছে নব্বই দশক থেকে তার এ জায়গায় বসবাস। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, চলতি বছরে জমিতে গিয়ে ওই বৈরাগী মহিলাকে আর খুজে পাওয়া গেল না! খবর নিয়ে জানা যায় মেম্বার পার্টির কোনো এক সদস্য উনার বাড়ি কিনে উদ্ভাস্তু এক পরিবারকে বসিয়ে দখল নিয়েছে। অর্থাৎ উচ্ছেদ কার্যক্রম কার্যত সফল।  বহুদিন ধরে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে বাড়িঘরের মায়া ছাড়তে হলো জ্যোতি রাণীকে।

সেই বিকেলে আরেকজন মহিলাকে পাওয়া যায়। নিজের জমিতে বহুদিন ধরে দাড়ানোর সাহস পাচ্ছেন না। কোথাও অভিযোগ দেয়ার সুযোগটাও হয়তো নেই। কারণ মেম্বার পার্টির সদস্যরা হুমকি দিয়ে গেছে উনার যেটুকু জমি আছে তাতে যেনো হাত না দেয়। শুধু তাই নয়, একযুগের বেশি সময় ধরে যে মন্দিরে পূজো করেন সেই মন্দিরটাকেও উঠিয়ে দেয়া হবে বলে শাসিয়ে গেছে তারা। সবাইকে বলতে দেখে আদরের নাতিকে কোলে নিয়ে ছুটে আসলেন নিজের আক্ষেপের কথা বলতে। যেনো সাগরে ডুবে যাবার আগে খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা! 

মন্দির কমিটির সভাপতি অনিমেষ দাদা এক দৃঢ় প্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব। মাসখানেক আগে ভুক্তভোগী কতগুলো পরিবারকে সাথে করে সংসদ সদস্যের বাড়িতে অসহায়ের মত ছুটে গেছেন। লিখিত অভিযোগ জমা করেছেন কিন্তু সুরাহার আশ্বাস ছাড়া পাননি আর কিছুই। 

ডিসেম্বরের ওই বিকেলে আরেকটি পরিবারের সদস্য রুদ্র সাহার সাথে কথা হলো। রুদ্রর মা নিপু রাণী, চার চার বার মেঘনার ভাঙনে শূণ্যহাতে ত্রিশ বছর ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন। একটা এনজিওতে চাকরি করে তিলে তিলে টাকা জমাচ্ছিলেন নিজের স্থায়ী ঠিকানা গড়ার। কিন্তু কথায় আছে অভাগা যেদিকে যায় সাগর সেখানে শুকিয়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ২০০৮-এ জমি কিনলেও ২৪ এ বাড়ি নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন। টাকা পয়সার টানাটানিতে ছাদ পর্যন্ত ঢালাই দিয়ে বাকি কাজ বন্ধ রাখতে হলো। কিন্তু মাস চারেকপর মোজাম্মেল নামক স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে মোবাইলে খবর পেলেন স্বৈরাচার সরকার পতনের সাথে সাথে তার বাড়ির মালিকানাও নাকি চলে গেছে! জায়গার মালিক এখন ভুট্টু মেম্বার, তার কাছ থেকে এই জায়গা পুনরায় কিনে নিতে হবে, নয়তো কিছু টাকা নিয়ে চলে যেতে হবে! সঙ্গে সঙ্গে নোয়াখালীর দ্বীপ এলাকা হাতিয়া থেকে নদী পাড়ি দিয়ে ছুটে আসলেন, দেখলেন ঘটনা আসলেই সত্যি। একি দাগে যতজনের জমি আছে কেউ আর চাষবাস, নির্মাণ কাজ করতে পারছেনা। পাশের বৈরাগনীর ভিটে বাড়ির গাছ বিক্রির টাকা কারা যেনো নিয়ে গেছে। 

অনেক ছুটাছুটি করে ওখানকার সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা যার অগোচরে এলাকাতে কিছুই ঘটে না, স্থানীয় এমপির খুবই নিকটস্থ ব্যক্তি, সেই সুমন মেম্বারের দারস্থ হলেন। উনার প্রস্তাব, "আপনারা বায়না চুক্তি করেন ভুট্টুর সাথে, তারপর বাড়ির কাজ করেন। কিনতে গেলে অনেক বায়নাপত্র করতেতো আর বেশি লাগে না।" আজ অবধি সুমন মেম্বার একই পরামর্শে অটল আছেন। বলতেই হবে এক কথার মানুষ, যাকে বলে নেতার মত নেতা! 

কিন্তু না, নিপু রাণী দ্বিতীয়বার জমি কিনতে রাজি হননি। জীবনে বহু চড়াই উতরাই পার করেছেন, শেষ বয়সে এসে না হয় আরেকটু করবেন। কন্ট্রাক্টর শাহাদাতকে বললেন মিস্ত্রি নিয়ে কাজ শুরু করতে। ছাদ ঢালাই করে নিতে যেহেতু কারো সমস্যা হলো না, এখন দেয়াল তুলতে কার সমস্যা হয় দেখা যাক। কিন্তু কন্ট্রাক্টর বেঁকে বসলো। সে আর বাকি কাজ করতে রাজি নয়। শুনা গেলো তার বাবা চৌকিদার তাই ভবিষ্যতে এলাকার মেম্বার  হওয়ার শখ। এখানে কাজ করে অযথা অন্য মেম্বারদের সাথে ঝামেলায় জড়াতে চান না। চৌকিদার বাবা নিপু রাণীকে দেখলে সাবধানে এড়িয়ে চলেন, হয়তো ছেলের কর্মকান্ডে তিনিও খানিকটা লজ্জিত। এভাবে দুবছর চলে গেলো। ২০২৬ এ এসে তিনবার হামলার স্বীকার হলেন। অসি-ডিসি-এসপি, ইউনো কিংবা এসিল্যান্ড, বিএনপি কিংবা এনসিপি আর কোর্টের বারান্দা, নোয়াখালীর এমন কোনো টেবিল বাদ পড়েনি যেখানে বাদিনী নিপু সাহার নাম পৌছাইনি। শেষ বয়সে ক্লান্ত শরীরে তার ঘর বাধার এ লড়াইয়ে সামিল হবার লোক কোথায়?

ডিসেম্বরের সন্ধ্যা খুব তাড়াতাড়ি নামে। ঠান্ডা হাওয়া আর চারদিকের নির্জনতা ঘরে ফেরার তাগাদ দিচ্ছিলো, তখনি দৃশ্যপটে হাজির পলি রাণী। জানা গেলো তারও ভবিষ্যতে মেম্বার হবার ইচ্ছে তবে মেম্বারপার্টির সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। স্বামী বিদেশে থাকা অবস্থায় একা হাতে সন্তানদের মানুষ করা থেকে শুরু করে টুকটাক জমি কেনাবেচা করতে গিয়ে নানা কারণে মেম্বারপার্টির চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন। ওই দাগে সবচেয়ে বেশি জমির মালিকানা পলি রাণীর ছিল। দাপুটে আর সম্মোহনী ক্ষমতায় বেশিরভাগই বিক্রি করে এখন সবার কাছে দায়ী হয়ে গেছেন। জানালেন জায়গা উদ্ধার করতে প্রয়োজনে নিজের গহনা বিক্রি করে আইনী লড়াই চালাবো। কিছুদিন আগে, তহসিল অফিসের লোকজনের উপস্থিতিতেই বিদেশ ফেরত জামাইসহ হুমকির স্বীকার হন। জীবননাশের আশংকায় সারারাত তালাবদ্ধ থেকে পরদিন থানায় জিডি করেন। কিন্তু এই কাগজের জিডি তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা যেনো একটুও কমায়নি বরং বাড়িয়েছে। মেম্বারপার্টির মামলাবাজির অন্তর্জালে এখন একমাত্র বসবাসের জায়গাটুকু নিয়েও কোর্টের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে।

ডিসেম্বরের সন্ধ্যা তখন প্রায় রাত। একজন রাণীর সাথে তখনো দেখা হওয়ার বাকি। উপন্যাসের চরিত্রে যাকে বলা হয় দস্যি মেয়ে। নাম তার রেখা রাণী, কাস্তে হাতে ধান কাটে কোদাল হাতে মাটি। অক্ষর জ্ঞান না থাকতে পারে তবুও সাহসের কমতি কোনো অংশে কম নেই। এই একজনের কাছে মেম্বারপার্টি চরমভাবে পরাজিত। দ্বিতীয় ডিসেম্বরে বাড়ির সামনের অল্প কিছু জমিতে বগিদা হাতে টিনশেড ঘর তুলে সংসার পেতেছে রেখা রাণী। জমি সৃষ্টিকারী মালিকের শেষ ওয়ারিশদের একজন। সেদিন এমপি মহোদয়ের ছেলের উপস্থিতিতে সবাই বিনা হেতু দাড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেও এই একজন নিজের আসন ছাড়েনি। দারিদ্রতা, নিরক্ষরতা অথবা মেম্বারপার্টির আতংক জয়ী করে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারা একমাত্র নারী রেখা! সত্যিকারের রাণী হয়তো এমনই। 

এদিকে মেম্বার পার্টিরও একটা শৈল্পিক দিক আছে। তারা সবাই একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মী। যেমন মূল অভিযুক্ত ভুট্টু মেম্বার চরবাটা ইউনিয়ন যুবদলের সেক্রেটারি, হামলার নেতৃত্বদানকারী জুম্মন মেম্বার চরআমানুল্লাহ ইউনিয়ন যুবদলের সেক্রেটারি, মেম্বারদের মস্তিষ্ক খ্যাত আনোয়ার মেম্বার আবার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সুমন মেম্বার সুবর্ণচর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক!

তবে আবার ডিসেম্বর আসছে, তৃতীয় ডিসেম্বর। হয়তো নতুন কোনো রাণীর গল্প খুঁজে পাওয়া যাবে। যে গল্প কাউকে করবে গৃহহীন কাউকে দেশান্তরী। যে রাণীরা লড়াই করে যাবে, তারা প্রতিনিয়ত শংকায় থাকবে। মাঝ রাতে অপরিচিত শব্দে সজাগ হয়ে উঠবে। বালিশের কোনা হাতড়ে টর্চটা জ্বালিয়ে চারদিকে একবার দেখে নেবে। এভাবেও মানুষ বাঁচতে পারে। কিন্তু এ বাঁচার মধ্যে ওই স্বাধীনতাটি নেই যা লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে কেনা।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধ: সাভারে দুইজনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম, হাসপাতালে ভর্তি।

ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধ: সাভারে দুইজনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম, হাসপাতালে ভর্তি।

বিজয়ের আগস্ট শুরু: গণঅভ্যুত্থানের ৩২ জুলাইয়ে নিষিদ্ধ জামায়াত, চারিদিকে লাশের মিছিল

বিজয়ের আগস্ট শুরু: গণঅভ্যুত্থানের ৩২ জুলাইয়ে নিষিদ্ধ জামায়াত, চারিদিকে লাশের মিছিল

দলের পেছনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব কর্মী, টাকার অভাবে নিজ বাড়িতেই শয্যাগত হামিদুল।

দলের পেছনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব কর্মী, টাকার অভাবে নিজ বাড়িতেই শয্যাগত হামিদুল।

বাংলাদেশের মেরিটাইম সেক্টরে নতুন দিগন্ত: ‘অ্যাসোসিয়েশন অব মেরিটাইম প্রফেশনালস’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি গঠন!

বাংলাদেশের মেরিটাইম সেক্টরে নতুন দিগন্ত: ‘অ্যাসোসিয়েশন অব মেরিটাইম প্রফেশনালস’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি গঠন!

১৭ বছর রাজপথে থেকে আজ ষড়যন্ত্রের শিকার! অষ্টগ্রাম বিএনপির কান্ডারি সাঈদ আহমেদ।

১৭ বছর রাজপথে থেকে আজ ষড়যন্ত্রের শিকার! অষ্টগ্রাম বিএনপির কান্ডারি সাঈদ আহমেদ।

​গণভোট, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে আজ কুড়িগ্রামে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা।

​গণভোট, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে আজ কুড়িগ্রামে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা।

পাথালিয়া ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের মাঝে রেইনকোট বিতরণ।

পাথালিয়া ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের মাঝে রেইনকোট বিতরণ।

লালবাগে জিয়া সাইবার ফোর্সের সাংগঠনিক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত।

লালবাগে জিয়া সাইবার ফোর্সের সাংগঠনিক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গবেষণার ভূমিকা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গবেষণার ভূমিকা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার সীতাকুণ্ড উপজেলা কমিটি ঘোষণা

বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার সীতাকুণ্ড উপজেলা কমিটি ঘোষণা

শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের ইলিশ রক্ষায় ধারাবাহিক অভিযান

শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের ইলিশ রক্ষায় ধারাবাহিক অভিযান

এআই ও বিকৃত কনটেন্ট নিয়ে মেহজাবীনের প্রশ্ন: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

এআই ও বিকৃত কনটেন্ট নিয়ে মেহজাবীনের প্রশ্ন: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

রাজধানীতে ডিএমপির অভিযানে ৭৫৯ জন গ্রেপ্তার

রাজধানীতে ডিএমপির অভিযানে ৭৫৯ জন গ্রেপ্তার

পাটগ্রামে অবৈধ ভুট্টাবীজ প্যাকেটজাতের অভিযোগ ও গোডাউন সিলগালা

পাটগ্রামে অবৈধ ভুট্টাবীজ প্যাকেটজাতের অভিযোগ ও গোডাউন সিলগালা

এইচপিভি টিকা: ৪ বছরের মেয়েদেরও সুপারিশ ডব্লিউএইচওর

এইচপিভি টিকা: ৪ বছরের মেয়েদেরও সুপারিশ ডব্লিউএইচওর

তিন বিভাগে বৃষ্টির পূর্বাভাস, রাতের তাপমাত্রা কমার আভাস

তিন বিভাগে বৃষ্টির পূর্বাভাস, রাতের তাপমাত্রা কমার আভাস

বার্নিকাটের গাড়িবহরে হামলা: আদালতে পুলিশ পরিদর্শকের সাক্ষ্য

বার্নিকাটের গাড়িবহরে হামলা: আদালতে পুলিশ পরিদর্শকের সাক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ল মূল্যস্ফীতি, ফের সুদের হার বৃদ্ধির শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ল মূল্যস্ফীতি, ফের সুদের হার বৃদ্ধির শঙ্কা

দুই বছর পর পর্দায় ফিরছে চঞ্চল চৌধুরীর আলোচিত সিরিজ ‘ফেউ’

দুই বছর পর পর্দায় ফিরছে চঞ্চল চৌধুরীর আলোচিত সিরিজ ‘ফেউ’

শাহজালালে শাড়ির নিচে মিলল ৪ কেজি কুশ, ভারতীয় নাগরিক গ্রেপ্তার

শাহজালালে শাড়ির নিচে মিলল ৪ কেজি কুশ, ভারতীয় নাগরিক গ্রেপ্তার

Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


সুবর্ণচরের আতংক 'মেম্বার পার্টি' আর কিছু চাপা পড়া গল্প

প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে স্বঘোষিত 'মেম্বার' পদবীধারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে এর নেতৃত্বে রয়েছে নুর মোহাম্মদ ভুট্টু ওরফে ভুট্টু মেম্বার। যাদের মূল কাজ জমি দখল করা। এই মেম্বার পার্টির কাছে হয় ব্রিটিশ আমলের নয়তো পাকিস্তান আমলের টিপসই দলিল থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত কোন দলিল, খতিয়ান, দাখিলা কিংবা নামজারির মত কাগজপত্র কিছুই থাকে না। ওই টিপসই দলিলকে পুজি করে মামলাবাজির মাধ্যমে তিন পুরুষ যাবৎ বসবাসরত সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করছে এই চক্র। যার মূল টার্গেট হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। এমনি কিছু ভিক্টিম পরিবারের কথা এখানে তুলে ধরা হলো।

২৪ সালে ডিসেম্বরের এক বিকেলে হিন্দু পরিষদ নামক একটি সংগঠন অভিযোগকারী এক পরিবারের অবস্থা দেখতে যায়। ঘটনাস্থলে দেখা হয় জ্যোতি রাণী বৈষ্ণবী নামক সংসার ত্যাগী এক নারীর সঙ্গে। জরাজীর্ণ ছোট্ট টিনের ঘরে একাকি বসবাস ষাটোর্ধ এই নারীর। শীতের ঠান্ডা হাওয়া ভাঙা বেড়ার একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশে বার হচ্ছে। নাহ লেপ কম্বল দিয়ে এই ঠান্ডাতো আটকানো সম্ভব নাহ। ঘর মেরামত করছেন না কেনো? জিজ্ঞেস করায় মিললো ভিন্নধর্মী উত্তর। ঘর ঠিক করতে বাড়ির কিছু গাছ কেটে বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু সেই বিক্রি করা গাছের টাকা হাতে পাওয়ার আগেই সুমন মেম্বার নামক কোনো এক ব্যক্তি গাছগুলো তুলে নিয়ে গেছে! সুমন মেম্বার কোন ইউনিয়নের মেম্বার? জিজ্ঞেস করায় উত্তর আসলো, 'সবাই ডাকে মেম্বার আমরাও ডাকি মেম্বার, কোন ইউনিয়নের মেম্বার সেইটা জানিনা।' ভিক্ষাবৃত্তি করে বৈরাগ্যের জীবনযাপন করা সংসার ত্যাগী এমন একজন বৃদ্ধার ধনেও কারোর লোভ থাকতে পারে ভাবা যায় না। আচ্ছা আমরা মিস্ত্রি ঠিক করে ঘর করে দিবো? উত্তর দিলো মিস্ত্রি এলে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়, কারোর ক্ষমতা নেই উনার ঘর ঠিক করে দেয়ার। এরপরের অভিযোগ আরো গুরুতর, এখানে বসবাস করতে তার কাছে সাত লক্ষ টাকা চাওয়া হয়েছে, কারণ সরকার পতনেরপর থেকে তিনি আর জায়গার মালিক নাই! অথচ উনার দলিল বলছে নব্বই দশক থেকে তার এ জায়গায় বসবাস। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, চলতি বছরে জমিতে গিয়ে ওই বৈরাগী মহিলাকে আর খুজে পাওয়া গেল না! খবর নিয়ে জানা যায় মেম্বার পার্টির কোনো এক সদস্য উনার বাড়ি কিনে উদ্ভাস্তু এক পরিবারকে বসিয়ে দখল নিয়েছে। অর্থাৎ উচ্ছেদ কার্যক্রম কার্যত সফল।  বহুদিন ধরে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে বাড়িঘরের মায়া ছাড়তে হলো জ্যোতি রাণীকে।

সেই বিকেলে আরেকজন মহিলাকে পাওয়া যায়। নিজের জমিতে বহুদিন ধরে দাড়ানোর সাহস পাচ্ছেন না। কোথাও অভিযোগ দেয়ার সুযোগটাও হয়তো নেই। কারণ মেম্বার পার্টির সদস্যরা হুমকি দিয়ে গেছে উনার যেটুকু জমি আছে তাতে যেনো হাত না দেয়। শুধু তাই নয়, একযুগের বেশি সময় ধরে যে মন্দিরে পূজো করেন সেই মন্দিরটাকেও উঠিয়ে দেয়া হবে বলে শাসিয়ে গেছে তারা। সবাইকে বলতে দেখে আদরের নাতিকে কোলে নিয়ে ছুটে আসলেন নিজের আক্ষেপের কথা বলতে। যেনো সাগরে ডুবে যাবার আগে খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা! 

মন্দির কমিটির সভাপতি অনিমেষ দাদা এক দৃঢ় প্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব। মাসখানেক আগে ভুক্তভোগী কতগুলো পরিবারকে সাথে করে সংসদ সদস্যের বাড়িতে অসহায়ের মত ছুটে গেছেন। লিখিত অভিযোগ জমা করেছেন কিন্তু সুরাহার আশ্বাস ছাড়া পাননি আর কিছুই। 

ডিসেম্বরের ওই বিকেলে আরেকটি পরিবারের সদস্য রুদ্র সাহার সাথে কথা হলো। রুদ্রর মা নিপু রাণী, চার চার বার মেঘনার ভাঙনে শূণ্যহাতে ত্রিশ বছর ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন। একটা এনজিওতে চাকরি করে তিলে তিলে টাকা জমাচ্ছিলেন নিজের স্থায়ী ঠিকানা গড়ার। কিন্তু কথায় আছে অভাগা যেদিকে যায় সাগর সেখানে শুকিয়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ২০০৮-এ জমি কিনলেও ২৪ এ বাড়ি নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন। টাকা পয়সার টানাটানিতে ছাদ পর্যন্ত ঢালাই দিয়ে বাকি কাজ বন্ধ রাখতে হলো। কিন্তু মাস চারেকপর মোজাম্মেল নামক স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে মোবাইলে খবর পেলেন স্বৈরাচার সরকার পতনের সাথে সাথে তার বাড়ির মালিকানাও নাকি চলে গেছে! জায়গার মালিক এখন ভুট্টু মেম্বার, তার কাছ থেকে এই জায়গা পুনরায় কিনে নিতে হবে, নয়তো কিছু টাকা নিয়ে চলে যেতে হবে! সঙ্গে সঙ্গে নোয়াখালীর দ্বীপ এলাকা হাতিয়া থেকে নদী পাড়ি দিয়ে ছুটে আসলেন, দেখলেন ঘটনা আসলেই সত্যি। একি দাগে যতজনের জমি আছে কেউ আর চাষবাস, নির্মাণ কাজ করতে পারছেনা। পাশের বৈরাগনীর ভিটে বাড়ির গাছ বিক্রির টাকা কারা যেনো নিয়ে গেছে। 

অনেক ছুটাছুটি করে ওখানকার সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা যার অগোচরে এলাকাতে কিছুই ঘটে না, স্থানীয় এমপির খুবই নিকটস্থ ব্যক্তি, সেই সুমন মেম্বারের দারস্থ হলেন। উনার প্রস্তাব, "আপনারা বায়না চুক্তি করেন ভুট্টুর সাথে, তারপর বাড়ির কাজ করেন। কিনতে গেলে অনেক বায়নাপত্র করতেতো আর বেশি লাগে না।" আজ অবধি সুমন মেম্বার একই পরামর্শে অটল আছেন। বলতেই হবে এক কথার মানুষ, যাকে বলে নেতার মত নেতা! 

কিন্তু না, নিপু রাণী দ্বিতীয়বার জমি কিনতে রাজি হননি। জীবনে বহু চড়াই উতরাই পার করেছেন, শেষ বয়সে এসে না হয় আরেকটু করবেন। কন্ট্রাক্টর শাহাদাতকে বললেন মিস্ত্রি নিয়ে কাজ শুরু করতে। ছাদ ঢালাই করে নিতে যেহেতু কারো সমস্যা হলো না, এখন দেয়াল তুলতে কার সমস্যা হয় দেখা যাক। কিন্তু কন্ট্রাক্টর বেঁকে বসলো। সে আর বাকি কাজ করতে রাজি নয়। শুনা গেলো তার বাবা চৌকিদার তাই ভবিষ্যতে এলাকার মেম্বার  হওয়ার শখ। এখানে কাজ করে অযথা অন্য মেম্বারদের সাথে ঝামেলায় জড়াতে চান না। চৌকিদার বাবা নিপু রাণীকে দেখলে সাবধানে এড়িয়ে চলেন, হয়তো ছেলের কর্মকান্ডে তিনিও খানিকটা লজ্জিত। এভাবে দুবছর চলে গেলো। ২০২৬ এ এসে তিনবার হামলার স্বীকার হলেন। অসি-ডিসি-এসপি, ইউনো কিংবা এসিল্যান্ড, বিএনপি কিংবা এনসিপি আর কোর্টের বারান্দা, নোয়াখালীর এমন কোনো টেবিল বাদ পড়েনি যেখানে বাদিনী নিপু সাহার নাম পৌছাইনি। শেষ বয়সে ক্লান্ত শরীরে তার ঘর বাধার এ লড়াইয়ে সামিল হবার লোক কোথায়?

ডিসেম্বরের সন্ধ্যা খুব তাড়াতাড়ি নামে। ঠান্ডা হাওয়া আর চারদিকের নির্জনতা ঘরে ফেরার তাগাদ দিচ্ছিলো, তখনি দৃশ্যপটে হাজির পলি রাণী। জানা গেলো তারও ভবিষ্যতে মেম্বার হবার ইচ্ছে তবে মেম্বারপার্টির সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। স্বামী বিদেশে থাকা অবস্থায় একা হাতে সন্তানদের মানুষ করা থেকে শুরু করে টুকটাক জমি কেনাবেচা করতে গিয়ে নানা কারণে মেম্বারপার্টির চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন। ওই দাগে সবচেয়ে বেশি জমির মালিকানা পলি রাণীর ছিল। দাপুটে আর সম্মোহনী ক্ষমতায় বেশিরভাগই বিক্রি করে এখন সবার কাছে দায়ী হয়ে গেছেন। জানালেন জায়গা উদ্ধার করতে প্রয়োজনে নিজের গহনা বিক্রি করে আইনী লড়াই চালাবো। কিছুদিন আগে, তহসিল অফিসের লোকজনের উপস্থিতিতেই বিদেশ ফেরত জামাইসহ হুমকির স্বীকার হন। জীবননাশের আশংকায় সারারাত তালাবদ্ধ থেকে পরদিন থানায় জিডি করেন। কিন্তু এই কাগজের জিডি তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা যেনো একটুও কমায়নি বরং বাড়িয়েছে। মেম্বারপার্টির মামলাবাজির অন্তর্জালে এখন একমাত্র বসবাসের জায়গাটুকু নিয়েও কোর্টের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে।

ডিসেম্বরের সন্ধ্যা তখন প্রায় রাত। একজন রাণীর সাথে তখনো দেখা হওয়ার বাকি। উপন্যাসের চরিত্রে যাকে বলা হয় দস্যি মেয়ে। নাম তার রেখা রাণী, কাস্তে হাতে ধান কাটে কোদাল হাতে মাটি। অক্ষর জ্ঞান না থাকতে পারে তবুও সাহসের কমতি কোনো অংশে কম নেই। এই একজনের কাছে মেম্বারপার্টি চরমভাবে পরাজিত। দ্বিতীয় ডিসেম্বরে বাড়ির সামনের অল্প কিছু জমিতে বগিদা হাতে টিনশেড ঘর তুলে সংসার পেতেছে রেখা রাণী। জমি সৃষ্টিকারী মালিকের শেষ ওয়ারিশদের একজন। সেদিন এমপি মহোদয়ের ছেলের উপস্থিতিতে সবাই বিনা হেতু দাড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেও এই একজন নিজের আসন ছাড়েনি। দারিদ্রতা, নিরক্ষরতা অথবা মেম্বারপার্টির আতংক জয়ী করে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারা একমাত্র নারী রেখা! সত্যিকারের রাণী হয়তো এমনই। 

এদিকে মেম্বার পার্টিরও একটা শৈল্পিক দিক আছে। তারা সবাই একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মী। যেমন মূল অভিযুক্ত ভুট্টু মেম্বার চরবাটা ইউনিয়ন যুবদলের সেক্রেটারি, হামলার নেতৃত্বদানকারী জুম্মন মেম্বার চরআমানুল্লাহ ইউনিয়ন যুবদলের সেক্রেটারি, মেম্বারদের মস্তিষ্ক খ্যাত আনোয়ার মেম্বার আবার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সুমন মেম্বার সুবর্ণচর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক!

তবে আবার ডিসেম্বর আসছে, তৃতীয় ডিসেম্বর। হয়তো নতুন কোনো রাণীর গল্প খুঁজে পাওয়া যাবে। যে গল্প কাউকে করবে গৃহহীন কাউকে দেশান্তরী। যে রাণীরা লড়াই করে যাবে, তারা প্রতিনিয়ত শংকায় থাকবে। মাঝ রাতে অপরিচিত শব্দে সজাগ হয়ে উঠবে। বালিশের কোনা হাতড়ে টর্চটা জ্বালিয়ে চারদিকে একবার দেখে নেবে। এভাবেও মানুষ বাঁচতে পারে। কিন্তু এ বাঁচার মধ্যে ওই স্বাধীনতাটি নেই যা লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে কেনা।


Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মেহেদী হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
সুবর্ণচরের আতংক 'মেম্বার পার্টি' আর কিছু চাপা পড়া গল্প
0:00 / 0:00
1x
অ্যাপ ডাউনলোড করুন