বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর

লাইফস্টাইল

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে কিছু ভাবনা!

১০ অক্টোবর ছিল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। দিনটি উপলক্ষে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু কথা বলতে ইচ্ছে হলো। মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে একটা বিষয় বারবার উপলব্ধি করেছি—আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণা এখনো অনেক গভীরে রয়ে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আমাকে বেশ ভাবায়।আমাদের সমাজে কেউ মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের কাছে যাচ্ছেন শুনলেই অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়, “কেন, পাগল হয়ে গেছে নাকি?” আবার অনেকেই নিজের মানসিক সমস্যার কথা বুঝতে পারলেও কাউন্সেলিং নিতে চান না। কারণ, পরিবার কী ভাববে, আত্মীয়স্বজন কী বলবে, পরিচিত কেউ জেনে গেলে কী হবে—এসব ভাবনাই তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে। অথচ একজন মানুষের কাউন্সেলিং নেওয়ার জন্য মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়া জরুরি নয়। আমরা অনেক সময় এই সাধারণ বিষয়টিই বুঝতে চাই না। একজন মানুষ হয়তো পড়াশোনা করছেন, চাকরি করছেন, পরিবারের দায়িত্ব পালন করছেন, বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কিন্তু তিনিও হয়তো দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, সম্পর্কের জটিলতা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া, কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, কিংবা নিজের আবেগ ও আচরণকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্যও একজন মানুষের পেশাদার মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।আমাদের আরেকটি সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধু মানসিক রোগের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কিংবা আবেগগত সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে অনেকেই বলেন, “এত চিন্তা করার কী আছে?”, “মন শক্ত করো”, “এসব কিছু না, ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু সব সমস্যার সমাধান শুধু মন শক্ত করার মধ্যে নেই। কিছু সমস্যার জন্য যেমন পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে পেশাদার সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে। অনেকের ধারণা, যাঁরা মনোবিজ্ঞান বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা করেন বা পেশাগতভাবে কাজ করেন, তাঁদের নিজেদের কোনো মানসিক সমস্যা থাকতে পারে না। তাঁরা কেন উদ্বিগ্ন হবেন, কেন বিষণ্নতায় ভুগবেন, কেন তাঁদের কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন হবে? এই ধারণাটিও ভুল। একজন মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীও একজন মানুষ। তাঁরও ব্যক্তিগত জীবন আছে, আবেগ আছে, মানসিক চাপ আছে। মানুষের মন ও আচরণ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা মানেই জীবনের সব পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে সামলে ফেলার ক্ষমতা থাকা নয়। প্রয়োজনে একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীও অন্য পেশাজীবীর সহায়তা নিতে পারেন, এবং এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।আমার মনে হয়, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। শুধু মানসিক রোগ সম্পর্কে জানলেই হবে না, মানসিক সুস্থতা বলতে কী বোঝায়, কখন সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে এবং কাউন্সেলিং আসলে কীভাবে কাজ করে—এসব বিষয়েও মানুষের পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। আমরা শারীরিক অসুস্থতাকে যতটা গুরুত্ব দিই, মানসিক কষ্টকে অনেক সময় ততটা গুরুত্ব দিই না। অথচ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমাদের সমাজে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হোক, যেখানে কেউ মানসিক কষ্টের কথা বলতে ভয় পাবেন না। কাউন্সেলিং নিতে গেলে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি হবে না। মানসিক সমস্যায় থাকা কাউকে দুর্বল বা অযোগ্য মনে করা হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, কারও মানসিক কষ্টকে ছোট করে না দেখে আমরা যেন তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শিখি। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা শুধু একটি নির্দিষ্ট দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবন, সম্পর্ক, আচরণ এবং একে অপরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে জড়িত। একজন মানুষ মানসিকভাবে কেমন আছেন, সেটিও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে দেখতে শেখা এবং প্রয়োজনে সহায়তা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই আমাদের জন্য বড় পরিবর্তন হতে পারে।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে কিছু ভাবনা!
অ্যাপ ডাউনলোড করুন