বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ঢাকার কেরানীগঞ্জের আটি, মধু সিটিতে অবস্থিত স্কোপাস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১০ অক্টোবর মাইন্ডরিডার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘মনের যত্ন সবার আগে’ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অংশগ্রহণ করেন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা, মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা বাড়ানো এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেওয়াই ছিল কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি প্রয়োজনের সময়ে পেশাদার সহায়তা গ্রহণে উৎসাহিত করা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এ ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮–১৯ অনুযায়ী, দেশে ১৮–৯৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৭–১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লিখিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেননি।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব, প্রয়োজনীয় সেবার সীমিত সুযোগ, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং মানসিক সমস্যাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন সংগঠনের গণমাধ্যমভিত্তিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যথাক্রমে ৫১৩, ৩১০ ও ৪০৩টি শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব সংখ্যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সংগৃহীত; এগুলো সরকারি জাতীয় মৃত্যুহার পরিসংখ্যান নয়।
এমন বাস্তবতায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আগাম সচেতনতা তৈরি, সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ চেনা, মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা অর্জন এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। এই লক্ষ্য সামনে রেখে মাইন্ডরিডার ফাউন্ডেশন ‘মনের যত্ন সবার আগে’ প্রকল্পের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মশালা পরিচালনা করছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও চাপ মোকাবিলায় গুরুত্ব
কর্মশালায় মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা ও অসুস্থতা, সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ, মানসিক চাপ মোকাবিলার কৌশল এবং কখন ও কোথায় পেশাদার সহায়তা নিতে হবে—এসব বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
শিক্ষার্থীদের বোঝানো হয়, মানসিক সমস্যায় পড়া দুর্বলতার লক্ষণ নয় এবং প্রয়োজনের সময়ে সহায়তা চাওয়াও লজ্জার বিষয় নয়। শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রেও যথাযথ যত্ন ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া মনের কথা বিশ্বস্ত কারও কাছে প্রকাশ করা, কোনো পরিস্থিতির নেতিবাচক দিকের পাশাপাশি ইতিবাচক দিক বিবেচনা করা, সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান খোঁজা এবং অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, অন্যের মতামতকে সম্মান করা, বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং কারও মনোবল ভেঙে না দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সাড়া
তিন ঘণ্টাব্যাপী কর্মশালাটি ছিল অংশগ্রহণমূলক ও ইন্টারেক্টিভ। একমুখী বক্তৃতার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মতামত, প্রশ্ন ও পূর্বধারণাকে আলোচনার অংশ করা হয়। দলীয় কাজ, প্রশ্নোত্তর এবং বিভিন্ন ইন্টারেক্টিভ কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাবনা প্রকাশ ও দলগতভাবে কাজ করার সুযোগ পায়।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬-এর ‘Lived Experiences Heard: Real Voices, Real Change’ বার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত শোনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোন বিষয়গুলো তাদের মানসিক চাপের কারণ হয়ে ওঠে এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তাদের কী প্রশ্ন রয়েছে, সেসব বিষয় আলোচনায় উঠে আসে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহায়ক পরিবেশের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করা হয়। কর্মশালা শেষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং গঠনমূলক মতামত আয়োজকদের উৎসাহিত করেছে বলে জানানো হয়।
৯০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা
‘মনের যত্ন সবার আগে’ প্রকল্পকে ধারাবাহিক উদ্যোগ হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে মাইন্ডরিডার ফাউন্ডেশন। প্রথম পর্যায়ে ঢাকা ও আশপাশের ৯০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কর্মশালা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তৈরি, মানসিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা তৈরি এবং প্রয়োজনের সময়ে পেশাদার সহায়তা গ্রহণে উৎসাহিত করা। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা কমিয়ে সহায়তা চাওয়ার অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাইন্ডরিডার ফাউন্ডেশনের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। সুস্থতা বজায় রাখা, ঝুঁকি কমানো, সমস্যাকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনের সময়ে যথাযথ সহায়তা গ্রহণের বিষয়গুলোও মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার অংশ।
প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমর্থন পেলে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং সেশন, ক্রাইসিস হটলাইন সেবাসহ আরও কার্যকর ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে ফাউন্ডেশনটির। দেশের মানুষের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পৌঁছে দেওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য ও গ্রহণযোগ্য করতে এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
উপস্থিত ছিলেন যারা
কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন স্কোপাস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল শামসুন নাহার শিলা, একাডেমিক হেড ও সিনিয়র শিক্ষক আকাশ খান এবং মাইন্ডরিডার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোকাদ্দেস আলী।
কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাইন্ডরিডার ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট ম্যানেজার রুবাইয়া আমিন অর্পা, রাজিয়া সুলতানা ঝুমুর, সুখী আক্তার লিমা এবং উম্মে স্মিতা শান্ত।