বন্ধ করুন
বাংলাদেশে সাইকোলজিস্টদের নিবন্ধনের আওতায় আনা কেন জরুরি?
ডিজাইন:
100%
ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ
দৈনিক পত্রিকা


দৈনিক পত্রিকা ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ

ইপেপার সংস্করণ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ দৈনিক পত্রিকা

Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ


বাংলাদেশে সাইকোলজিস্টদের নিবন্ধনের আওতায় আনা কেন জরুরি?


মাহাদী-উল-মোর্শেদ
মাহাদী-উল-মোর্শেদ গবেষক ও পলিসি এনালিস্ট
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট:
বাংলাদেশে সাইকোলজিস্টদের নিবন্ধনের আওতায় আনা কেন জরুরি?
বাংলাদেশে সাইকোলজিস্টদের নিবন্ধনের আওতায় আনা কেন জরুরি?
Featured Image

বাংলাদেশে চিকিৎসা বা অন্যান্য পেশার জন্য নির্দিষ্ট রেগুলেটরি বডি থাকলেও মনস্তাত্ত্বিক সেবা প্রদানকারীদের জন্য বাধ্যতামূলক কোনো সরকারি লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে যে কেউ মানসম্মত সনদ বা সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়া নিজেকে "কাউন্সেলর" বা "সাইকোলজিস্ট" হিসেবে দাবি করার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সুরক্ষা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক জনস্বার্থ বিচারে সাইকোলজিস্টদের প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলোঃ

১. অপচিকিৎসা ও অনভিজ্ঞ সেবা প্রতিরোধ

মানসিক স্বাস্থ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ক্ষেত্র। ভুল কাউন্সেলিং বা বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান ছাড়া থেরাপি প্রদান করলে রোগীর মানসিক অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে, এমনকি আত্মহত্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। নির্দিষ্ট লাইসেন্সিং বা রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু থাকলে ভুয়া ও অদক্ষ প্রাকটিশনারদের সহজেই চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

২. পেশাগত নীতিমালার চর্চা নিশ্চিতকরণ

মনস্তাত্ত্বিক সেবার প্রধান ভিত্তি হলো গোপনীয়তা, পেশাদারিত্ব এবং নৈতিক সীমানা বজায় রাখা। লাইসেন্সপ্রাপ্ত সাইকোলজিস্টদের একটি নির্দিষ্ট আচরণবিধি বা ‘কোড অব এথিক্স’ মেনে চলতে হয়। নিবন্ধনের ব্যবস্থা থাকলে কোনো সেবা প্রদানকারী নৈতিকতা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ সুগম হয়।

৩. ন্যূনতম একাডেমিক ও ক্লিনিক্যাল যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ

মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষা যথেষ্ট নয় নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টার প্রত্যক্ষ ক্লিনিক্যাল ইন্টার্নশিপ ও সুপারভিশন প্রয়োজন হয়। নিবন্ধনের মাধ্যমে স্পষ্ট নিয়ম করা সম্ভব যে, কোন নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা (যেমন: স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাইকোলজিতে স্নাতক, এবং স্নাতকোত্তর), এবং কত ঘণ্টার প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ থাকলে একজন ব্যক্তি সেবা দেওয়ার যোগ্য হবেন।

৪. জনসাধারণের আস্থা অর্জন

কাউন্সেলিং বা থেরাপির জন্য সঠিক পেশাজীবী খুঁজে বের করা বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন। সরকারি বা স্বীকৃত কোনো কেন্দ্রীয় নিবন্ধিত তালিকা থাকলে মানুষ সহজেই যাচাই করে নিতে পারবেন তারা যার কাছে যাচ্ছেন তিনি প্রকৃত অর্থেই সার্টিফাইড সাইকোলজিস্ট কি না। এতে করে পুরো ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি হবে।

৫. আন্তঃপেশাগত সমন্বয় ও কাজের সীমানা স্পষ্টকরণ

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট), ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, স্কুল সাইকোলজিস্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাইকোলজিস্ট, ও সাইকোথেরাপিস্টদের কাজের ক্ষেত্র এবং সীমানা আলাদা। নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিটি পেশাজীবীর দায়িত্ব ও দক্ষতার সীমা নির্ধারণ করে দিলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়বে এবং বিভ্রান্তি দূর হবে।

তাহলে কী করণীয়ঃ

বাংলাদেশে সাইকোলজিস্টদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে একটি স্বাধীন ‘জাতীয় সাইকোলজি কাউন্সিল’ গঠন করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত কাঠামোটি নিচে তুলে ধরা হলোঃ

জাতীয় সাইকোলজি কাউন্সিলঃ

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। এর প্রধান কাজ হবে নীতি নির্ধারণ ও সার্বিক তদারকি করা। এই কাউন্সিলের পরিচালনা পর্ষদে জ্যেষ্ঠ সাইকোলজিস্ট, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং আইন বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত রাখা যেতে পারে।

কাউন্সিলের দুটি প্রধান উপ-বোর্ডঃ

১. নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং 

পেশাদার সাইকোলজিস্টদের ন্যূনতম একাডেমিক যোগ্যতা ও ইন্টার্নশিপ ঘণ্টা নির্ধারণ করা এবং আবেদন যাচাই-বাছাই করে লাইসেন্স প্রদান করা এই বোর্ডের দায়িত্ব হবে।

২. নৈতিকতা ও তদারকি

পেশাজীবীদের জন্য আচরণবিধি তৈরি করা, সেবাগ্রহীদের অভিযোগ গ্রহণ করা, অপচিকিৎসা রোধে তদন্ত চালানো এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়া এই বোর্ডের কাজ হবে।

​সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে নীতিমালা প্রণয়নঃ 

বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতি, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সকল সাইকোলজি স্টেকহোল্ডারদের যৌথ উদ্যোগে একটি সর্বজনগ্রাহ্য নীতিমালা তৈরি করা দরকার।

ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন (CPD) বাধ্যবাধকতাঃ

নিবন্ধিত প্রাকটিশনারদের লাইসেন্স নবায়নের জন্য নিয়মিত বিরতিতে নির্দিষ্ট ঘণ্টার কন্টিনিউয়িং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট (CPD) এবং সুপারভিশন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সুনির্দিষ্ট সুপারিশঃ

সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রাকটিশনারদের সুনির্দিষ্ট আইনগত কাঠামোর অধীনে আনা অপরিহার্য। কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করাই যথেষ্ট নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্য খাতকে টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে "উপরোল্লিখিত" পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন।

পরিশেষে, প্রাতিষ্ঠানিক এই নিবন্ধন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন জনগণের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার গ্রহণযোগ্যতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে পেশাদার সাইকোলজিস্টদের মর্যাদা ও কাজের আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় হবে।