প্রকৃতির খুব সাধারণ কিছু দৃশ্য। একটি ফুল, পাতার শিরা কিংবা ফুলের ওপর বসে থাকা ছোট্ট একটি মৌমাছি। অন্যের চোখে যা হয়তো নিছকই স্বাভাবিক দৃশ্য, তরুণ আলোকচিত্রী অভিউল মারুফের ক্যামেরায় সেটিই হয়ে ওঠে শিল্পের অনন্য ফ্রেম। প্রকৃতির এই নীরব সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রকাশনায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
হবিগঞ্জে জন্ম নেওয়া অভিউল বর্তমানে সিলেটে বসবাস করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ২০২২ সাল থেকে আলোকচর্চা করছেন তিনি। শুরু থেকেই প্রকৃতি, আলো-ছায়া এবং দীর্ঘ এক্সপোজারের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়।
সম্প্রতি তাঁর ‘Botanical Silence’ সিরিজের ছবিগুলো আলোকচিত্রপ্রেমীদের নজর কেড়েছে। ফুল, পাতা ও বিভিন্ন উদ্ভিদের সূক্ষ্ম গঠনকে ম্যাক্রো ও ক্লোজ-আপ ফ্রেমে তুলে ধরেছেন তিনি। গাঢ় পটভূমির ওপর আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম ব্যবহার ছবিগুলোতে তৈরি করেছে আলাদা আবহ।
২০২৬ সালে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে ধারণ করা ‘Botanical Silence’ সিরিজের ছবিগুলো প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। ফ্রান্সের ‘L'oeil de la Photographie’, ইতালির ‘Collater.al’ এবং অস্ট্রেলিয়ার ‘Byron Magazine’-এ তাঁর কাজ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁকে নিয়ে ‘WallMag’সহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মেও প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ‘Byron Magazine’-এ তাঁর ‘Botanical Silence’ সিরিজের একটি ছবি ‘The Quiet Poetry of Flowers’ শিরোনামের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
শুধু আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় জায়গা করে নেওয়াই নয়, ২০২৬ সালে সিলেট পরিবেশ সম্মেলনে আয়োজিত পরিবেশবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতেও চ্যাম্পিয়ন হন অভিউল।
যেভাবে শুরু আলোকচর্চার
অভিউলের আলোকচর্চার শুরুটা ছিল কৌতূহল থেকে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক রাতে তাঁর এক মামাকে অন্ধকারে ছবি তুলতে দেখে বিষয়টি তাঁকে আকৃষ্ট করে। পরে মুঠোফোনের ম্যানুয়াল মোড ও ট্রাইপড ব্যবহার করে নিজেই ছবি তোলার চেষ্টা শুরু করেন।
অন্ধকার দৃশ্য দীর্ঘ এক্সপোজারের মাধ্যমে কীভাবে আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও বেশি আগ্রহী করে তোলে। এরপর নিয়মিত দীর্ঘ এক্সপোজারের ছবি তুলতে শুরু করেন তিনি।
‘Nocturne’ অ্যালবাম ও ‘Midnight Magician’ সিরিজেও তাঁর দীর্ঘ এক্সপোজারভিত্তিক কাজের পরিচয় পাওয়া যায়।
মুঠোফোনেই চলছে আলোর খেলা
পেশাদার ক্যামেরার পাশাপাশি মুঠোফোনও অভিউলের আলোকচর্চার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। বর্তমানে Redmi মুঠোফোনের ক্যামেরার ম্যানুয়াল মোড ব্যবহার করেও তিনি নিয়মিত ছবি তুলছেন।
রাতের শহর, যানবাহনের আলোর রেখা, বজ্রপাত কিংবা প্রকৃতির সূক্ষ্ম দৃশ্য—বিভিন্ন বিষয়কে দীর্ঘ এক্সপোজারের মাধ্যমে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন তিনি। কখনো ট্রাইপড ব্যবহার করেন, আবার কখনো হাতে ধরা মুঠোফোনেই তৈরি করেন আলোর ভিন্নধর্মী আবহ।
অভিউলের ‘Botanical Silence’ সিরিজের মূল ভাবনাও প্রকৃতির এমন কিছু নীরব সৌন্দর্যকে সামনে আনা, যা প্রতিদিন চোখের সামনে থাকলেও ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় আমরা খেয়াল করি না।
একটি ফুলের ওপর আলো পড়ার মুহূর্ত, পাতার সূক্ষ্ম শিরা কিংবা ফুলে বসে থাকা একটি মৌমাছি—সাধারণ এসব দৃশ্যকেই নিজের ক্যামেরার ভাষায় নতুনভাবে তুলে ধরছেন তরুণ এই আলোকচিত্রী।
পড়াশোনার পাশাপাশি আলোকচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন অভিউল মারুফ। তাঁর ক্যামেরায় প্রকৃতির নীরব গল্প এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে।