উপমহাদেশের মানচিত্রে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের আত্মপ্রকাশ ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ঘটনা। এই দীর্ঘ এবং জটিল প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে সাধারণত যার নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে প্রশ্ন ওঠে—মুসলিমদের জন্য আলাদা দেশ গঠনের পুরো ‘ক্রেডিট’ বা একক কৃতিত্ব কি কেবলই জিন্নাহর? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সমীকরণ এবং পরবর্তী সময়ে বাঙালির এক চরম স্বপ্নভঙ্গের ট্র্যাজিক ইতিহাস?
রাজনৈতিক মঞ্চ ও গণভিত্তির রূপকার: জিন্নাহর ক্রেডিট যেখানে সীমাবদ্ধ
পাকিস্তান সৃষ্টির প্রধান স্থপতি বা চূড়ান্ত স্তরের চালিকাশক্তি হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আইনি দক্ষতার অবদান অনস্বীকার্য। তবে জিন্নাহ একা একটি রাষ্ট্র তৈরি করেননি। পাকিস্তান আন্দোলন ছিল একটি দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক ও গণ-আন্দোলনের ফসল, যার মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল জিন্নাহর রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার বহু আগেই।
এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে চারজন ব্যক্তিত্বের অবদানকে কোনোভাবেই আড়াল করা সম্ভব নয়:
স্যার সৈয়দ আহমদ খান ও আদর্শিক ভিত্তি: উনবিংশ শতাব্দীতে আলিগড় আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার পাশাপাশি তিনিই প্রথম ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’ (Two-Nation Theory)-এর বীজ বপন করেছিলেন। জিন্নাহ পরবর্তীতে এই তত্ত্বকেই নিজের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
নবাব সলিমুল্লাহ ও রাজনৈতিক মঞ্চ: ১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি মূল ও অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন। নবাব সলিমুল্লাহর গড়া এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি না থাকলে জিন্নাহ পরবর্তীতে মুসলমানদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করার কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় মঞ্চই পেতেন না।
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ও স্বাধিকারের দিকদর্শন: ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব (যা পরে পাকিস্তান প্রস্তাব নামে পরিচিত হয়) উত্থাপন করেছিলেন বাংলার এই সিংহপুরুষ। তাঁর উত্থাপিত এই বলিষ্ঠ প্রস্তাবই মুসলিম লীগের রাজনীতিকে নিখাদ স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম—গণশক্তির উৎস: ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের অভাবনীয় ও একচ্ছত্র বিজয়ের পেছনে এই দুই নেতার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। বাংলার মুসলমানদের এই বিপুল গণসমর্থন ছাড়া জিন্নাহর পক্ষে ব্রিটিশ এবং কংগ্রেসের সামনে জোরালোভাবে পৃথক রাষ্ট্রের দাবি টিকিয়ে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।
সহজ কথায়, জিন্নাহ যদি এই আন্দোলনের দক্ষ ‘আর্কিটেক্ট’ বা স্থপতি হন, তবে স্যার সৈয়দ আহমদ ছিলেন এর ভিত্তিপ্রস্তর, নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন এর মঞ্চ এবং শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দীর মতো বাঙালি নেতারা ছিলেন এর মূল গণশক্তির জোগানদাতা।
ইতিহাসের নির্মম মোড়: বাঙালিদের ওপর উর্দুর আগ্রাসন ও স্বপ্নভঙ্গ
যে বাংলার মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে জিন্নাহকে উজাড় করে সমর্থন দিয়েছিল, দেশভাগের পর পরই তাদের মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র কয়েক মাসের মাথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নবগঠিত এই রাষ্ট্রটি বাঙালির জন্য কোনো মুক্তির বার্তা আনেনি, বরং এটি ছিল এক নতুন ধরনের ঔপনিবেশিক শাসন।
এর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে বাঙালির হাজার বছরের চেনা সংস্কৃতি ও ভাষার ওপর। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম ও শেষবারের মতো ঢাকায় আসেন। রেসকোর্স ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত অহংকার ও একনায়কতান্ত্রিক সুর নিয়ে ঘোষণা করেন— "Urdu and Urdu alone shall be the state language of Pakistan" (উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)।
তৎকালীন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৬%) অংশই ছিল বাংলাভাষী বাঙালি। জিন্নাহর এই বৈষম্যমূলক ও অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে বাংলার ছাত্রসমাজ ও আমজনতা মেনে নেয়নি। তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন স্থলেই জিন্নাহর মুখের ওপর "নো, নো" বলে তীব্র প্রতিবাদ জানায় তরুণেরা।
বায়ান্নর রক্তপাত ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
জিন্নাহর বপন করা সেই স্বৈরাচারী ও বৈষম্যের বীজ ১৯৫২ সালে এসে এক রক্তাক্ত ও চূড়ান্ত রূপ নেয়। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং বাংলার ন্যায্য অধিকারের দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সাধারণ মানুষ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল বের করে।
তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। নিজের মায়ের ভাষার মর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত, শফিউরসহ আরও বহু বীর সন্তান। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগের নজির আর কোথাও নেই।
বাঙালিদের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস আজ বিশ্বজুড়ে এক অনন্য ও সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্বীকৃত। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) বাঙালির এই আত্মত্যাগের দিনটিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে। আজ সারা পৃথিবীর মানুষ আমাদের শহীদদের স্মরণে নিজের মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই দিনটি পালন করে, যা বাঙালি জাতির জন্য এক পরম গৌরবের বিষয়।
জিন্নাহর প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধাবোধ যেভাবে ঘৃণায় রূপ নিল
বাঙালিরা জিন্নাহর রাজনৈতিক দূরদর্শিতাকে বিশ্বাস করেছিল এক নতুন ভোরের আশায়। কিন্তু জিন্নাহ ও তাঁর উত্তরসূরি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে বাঙালিদের সংস্কৃতি, ভাষা, অর্থনীতি ও মৌলিক অধিকারকে ধ্বংস করার নীল নকশা তৈরি করেছিলেন।
নিজের মায়ের ভাষাকে কেড়ে নেওয়ার এই ঔদ্ধত্য এবং পরবর্তীতে ছাত্রদের ওপর বুলেটের আঘাত—জিন্নাহর প্রতি বাঙালির সমস্ত রাজনৈতিক শ্রদ্ধাবোধকে তীব্র ও স্থায়ী ঘৃণায় রূপান্তর করে। জিন্নাহ বাংলার মানুষের কাছে আর কোনো ‘কায়েদে আজম’ বা মহান নেতা থাকেননি; বরং তিনি হয়ে ওঠেন এক স্বৈরাচারী ও শোষক শাসক গোষ্ঠীর প্রতীক।
ইতিহাস সাক্ষী, জিন্নাহর সেই উগ্র ও বৈষম্যমূলক এক-রাষ্ট্র নীতিই পাকিস্তানের অখণ্ডতার কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। যার চূড়ান্ত ও যৌক্তিক পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না—তা সে যত বড় নেতাই হোন না কেন।