বন্ধ করুন
নদী ভাঙ্গনে শীর্ষে সাঘাটা উপজেলা ৫২ বছরে যমুনার পেটে ২১ বর্গকিলোমিটার
ডিজাইন:
100%
ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ
দৈনিক পত্রিকা


দৈনিক পত্রিকা ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ

ইপেপার সংস্করণ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ দৈনিক পত্রিকা

Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ


নদী ভাঙ্গনে শীর্ষে সাঘাটা উপজেলা ৫২ বছরে যমুনার পেটে ২১ বর্গকিলোমিটার


মোঃ শহীদুল ইসলাম শহীদ
মোঃ শহীদুল ইসলাম শহীদ উপজেলা প্রতিনিধিঃ সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট:
নদী ভাঙ্গনে শীর্ষে সাঘাটা উপজেলা ৫২ বছরে যমুনার পেটে ২১ বর্গকিলোমিটার
নদী ভাঙ্গনে শীর্ষে সাঘাটা উপজেলা ৫২ বছরে যমুনার পেটে ২১ বর্গকিলোমিটার
Featured Image

নদীভাঙনে মানচিত্র থেকে দ্রুত মুছে যাচ্ছে গাইবান্ধার জনপদ। বিশেষ করে যমুনার করাল গ্রাসে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে জেলার সাঘাটা উপজেলা। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর স্যাটেলাইট ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নদী ভাঙনে ক্ষতির দিক থেকে দেশের শীর্ষে রয়েছে এ উপজেলা। ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যমুনার তীব্র ভাঙন ও গতিপথ পরিবর্তনে সাঘাটার প্রায় ২০ দশমিক ৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে উপজেলার হাজারো পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি, চরম দারিদ্র্য ও বাধ্যতামূলক জলবায়ু অভিবাসনের শিকার হচ্ছে।

গবেষণার তথ্যমতে,সাঘাটার ভারতখালী, সাঘাটা সদর, হলদিয়া, কামালেরপাড়া, ঘুড়িদহ,জুমারবাড়ি ও মুক্তিনগর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ভাঙনের মূল তাণ্ডব। এসব এলাকার বহু পরিবার চার-পাঁচবার পর্যন্ত ভাঙনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছে। নিজেদের সামাজিক অবস্থান, আবাদি জমি ও জীবিকা হারিয়ে এসব মানুষ এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।

সিইজিআইএসের হিসাবে, প্রতি এক বর্গকিলোমিটার জমি বিলীন হলে গড়ে এক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। সেই হিসাবে কেবল সাঘাটায়ই ভিটেমাটি হারিয়েছেন ২০ হাজারের বেশি মানুষ। সহায়-সম্বল হারানো পরিবারগুলো প্রথমে স্থানীয় বাঁধ,সড়কের ধার কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ী ঝুপড়ি তুলে আশ্রয় নেয়। তবে সেখানে কর্মসংস্থান ও স্থায়ী আশ্রয়ের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের বস্তিতে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য রূপ নিচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ নগর বস্তির অনানুষ্ঠানিক সংকটে। অথচ নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া এসব বাস্তুচ্যুত মানুষের কোনো কেন্দ্রীয় বা সমন্বিত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার এখনো গড়ে ওঠেনি।

সিইজিআইএসের তথ্যমতে, গত ৫২ বছরে (১৯৭৩–২০২৫) দেশের প্রধান তিন নদী ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মার ভাঙনে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫৩ হেক্টর জমি বিলীন হয়েছে—যা রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট আয়তনের প্রায় পাঁচ গুণ। মোট ক্ষয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই গ্রাস করেছে যমুনা। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালেও দেশের ছয় জেলার ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে প্রায় ৯১৫ হেক্টর জমি নদী গর্ভে বিলীন ঝুঁকিতে রয়েছে,যার মধ্যে গাইবান্ধার অংশই সর্বোচ্চ প্রায় ২২৩ হেক্টর। এর মধ্যে সাঘাটার বসতভিটা, আবাদি জমি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও জেলার দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে,নদীভাঙন কেবল নদীর স্বাভাবিক আচরণ নয়; উজানের ঢল, অতিবৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। উন্নয়ন গবেষক ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে)-এর প্রতিষ্ঠাতা এম. আবদুস্ সালাম বলেন, নদীভাঙন সাঘাটাসহ পুরো গাইবান্ধার জীবন-জীবিকাকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। শুধু ভাঙন মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে কিছু জিও-ব্যাগ ফেলা বা নামমাত্র ত্রাণ বিতরণ করে এই সংকট দূর করা অসম্ভব। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি, পূর্বাভাসভিত্তিক আগাম পদক্ষেপ এবং স্থানান্তরিত পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।

নদী জমি কেড়ে নিলে শুধু ভূখণ্ডের মানচিত্রই বদলায় না, বদলে যায় মানুষের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ। তাই কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক উদ্যোগ নয়;সাঘাটাসহ গাইবান্ধার নদী তীরবর্তী জনপদ রক্ষা ও ক্ষতি গ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে কার্যকর ও সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নদী ভাঙ্গনে ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।