বাংলাদেশে চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্ভাবনের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২০ সাল থেকে নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন চিকিৎসক ও গবেষক ডা. আসিফ সৈকত (ডা. আসিফ উর রহমান) এবং তাঁর সহকর্মীরা। দেশীয় প্রযুক্তিতে লাইফ সাপোর্ট মেশিন তৈরির এই দীর্ঘ যাত্রায় ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটোটাইপ—‘SPONDON’ ও এর উন্নত সংস্করণ ‘VENTUS’।
ডা. আসিফ সৈকতের নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২০ সালে শুরু হয় এই উদ্যোগের পথচলা। দীর্ঘ গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিশ্রমের পর তৈরি করা হয় প্রথম প্রোটোটাইপ ‘SPONDON’। ২০২১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে এর সফল ট্রায়ালও সম্পন্ন হয়।
তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও করপোরেট চাপের কারণে সেই ট্রায়াল স্থগিত হয়ে যায়। কঠিন সেই পরিস্থিতিতেও তাঁরা কাজ থামিয়ে দেননি। বরং নতুন উদ্যমে শুরু করেন আরও উন্নত প্রযুক্তির মেশিন তৈরির কাজ।
প্রথম প্রোটোটাইপের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী চার বছর ধরে নিজেদের অর্থায়নে চলে গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ। এর ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় দ্বিতীয় প্রোটোটাইপ ‘VENTUS’। আগের মেশিনের তুলনায় আকার, স্মার্টনেস, ডিজিটালাইজেশন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিভিন্ন আধুনিক সুবিধার দিক থেকে ‘VENTUS’কে আরও উন্নত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৬ সালে ‘VENTUS’ নিয়ে আসে আরও আশাব্যঞ্জক খবর। জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের আইসিইউতে এর প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়। পরীক্ষায় একজন রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সহায়তা দিতে সক্ষম হয় মেশিনটি। তবে পূর্ণাঙ্গভাবে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের আগে আরও ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, কারিগরি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।
এই উদ্যোগের সঙ্গে ডা. আসিফ সৈকতের পাশাপাশি চিকিৎসক ডা. সিফায়েত ইনাম স্বাক্ষর এবং প্রকৌশলী বায়েজিদ শুভসহ অন্যরা যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশীয় বাস্তবতায় কম খরচে উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি তৈরির সম্ভাবনা নতুন করে সামনে এসেছে।
ডা. আসিফ সৈকতের পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও সক্রিয় ভূমিকা। তিনি বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসক সংগঠনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণও রয়েছে।
তবে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি হয়ে উঠেছে দেশীয় চিকিৎসা প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের এই গবেষণা। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একজন চিকিৎসক ও গবেষক হিসেবে দেশীয় প্রযুক্তিতে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
২০২০ থেকে ২০২৬—সাত বছরের এই পথচলা শুধু একটি মেশিন তৈরির গল্প নয়; এটি সীমিত সম্পদ, নানা বাধা ও দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেও গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি অটুট থাকার গল্প। ‘SPONDON’ থেকে ‘VENTUS’—এই যাত্রা দেখিয়েছে, মেধা, শ্রম, সাহস ও ধারাবাহিক গবেষণার সমন্বয় ঘটলে বাংলাদেশেও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব।
তবে উদ্ভাবনকে বাস্তব চিকিৎসাসেবায় নিয়ে যেতে হলে বৈজ্ঞানিক যাচাই, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ধাপগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। সেই পরীক্ষিত ও অনুমোদিত পথে ‘VENTUS’ এগিয়ে গেলে ভবিষ্যতে দেশের চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।