শহীদুল ইসলাম শহীদ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র ও ওএমআর শিট নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন এক শিক্ষার্থী। পরীক্ষার সময় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর কয়েকটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনায় উত্তরপত্রের সঙ্গে থাকা ওএমআর শিট পরিবর্তন করে ফলাফলে প্রভাব ফেলার অভিযোগ করেছেন ধর্মপুর এসআইডি ভোকেশনাল অ্যান্ড কারিগরি কলেজের শিক্ষার্থী মো. আল-রিশাদ মুগ্ধ।
এ ঘটনায় তিনি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তার রোল নম্বর ১৬১৩১৭ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর ২৭২৪১২১৬৬০।
লিখিত অভিযোগে আল-রিশাদ মুগ্ধ বলেন, পরীক্ষার শেষদিকে উত্তরপত্র জমা দেওয়ার সময় কয়েকজন শিক্ষক তাকে ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এমনকি পরীক্ষার ফরম পূরণেও তাকে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তার বাবার সঙ্গে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ কয়েকজন শিক্ষকের পূর্ববিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরেই তাকে পরীক্ষায় অকৃতকার্য করার হুমকি দেওয়া হয়। তার দাবি, উত্তরপত্রের সঙ্গে থাকা ওএমআর শিট পরিবর্তন করা হয়ে থাকতে পারে। অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত কয়েকজন শিক্ষক পরীক্ষা কেন্দ্রের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে ছিলেন। এ কারণে উত্তরপত্র ও ওএমআর শিট জমা, সংরক্ষণ, হস্তান্তর এবং বোর্ডে পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়েও তার সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
তবে প্রকাশিত মার্কশিট পর্যালোচনায় দেখা যায়, আল-রিশাদ মুগ্ধ বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। অন্যদিকে কয়েকটি কারিগরি ও ব্যবহারিক বিষয়ে তার ফলাফল বেশ ভালো।
ফলাফলে দেখা যায়, পদার্থবিজ্ঞানে ১৭৫-এর মধ্যে ১৪২, রসায়নে ১৭৫-এর মধ্যে ১৪০ এবং কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনে ১০০-এর মধ্যে ৯০ নম্বর পেয়ে তিনি এ+ পেয়েছেন। সেলফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনারশিপে ৫০-এর মধ্যে ৩৬, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িংয়ে ৫০-এর মধ্যে ৪৩ এবং ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষায় ১৫০-এর মধ্যে ১০৬ নম্বর পেয়েছেন।
এ ছাড়া আইটি সাপোর্ট অ্যান্ড আইওটি বেসিকস-১ এ ৪০০-এর মধ্যে ৩৪৩, আইটি সাপোর্ট অ্যান্ড আইওটি বেসিকস-২ এ ৪০০-এর মধ্যে ৩৩৭ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট ট্রেনিংয়ে ১০০-এর মধ্যে ৯৭ নম্বর পেয়ে এ+ পেয়েছেন। অ্যাকাউন্টিংয়ে ২০০-এর মধ্যে ১৩৬ নম্বর পেয়ে এ- পেয়েছেন তিনি।
একাধিক বিষয়ে ভালো ফলাফলের বিপরীতে চারটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শিক্ষার্থী ও তার পরিবার উত্তরপত্র এবং ওএমআর শিট যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর খাতা পুনঃপরীক্ষা ও পুরো পরীক্ষাপ্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।
আল-রিশাদ মুগ্ধ বলেন, “আমি নিয়ম মেনে প্রতিটি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু পরীক্ষার সময় হুমকি দেওয়ার পর কয়েকটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় আমার সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আমি চাই, আমার উত্তরপত্রসহ পুরো পরীক্ষাপ্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।”
শিক্ষার্থীর বাবা মুকুল মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। সেই বিরোধের প্রতিশোধ নিতে আমার ছেলেকে ফেল করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমার ছেলের উত্তরপত্র বোর্ডে না পাঠিয়ে সাদা খাতা জমা দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, “আমি বোর্ডে গিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে ছেলের খাতা দেখেছি। সেখানে খাতাটি ফাঁকা ছিল। বিষয়টি তদন্ত করে সুষ্ঠু সমাধান চাই।”
তবে শিক্ষার্থীর ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক মো. রিয়াজুর ইসলাম বলেন, “এই শিক্ষার্থী যথেষ্ট ভালো। ইংরেজি বিষয়ে তার ফেল করার কথা নয়। নিশ্চয়ই কোথাও কোনো সমস্যা হয়েছে।”
গণিত বিষয়ের শিক্ষক দীপংকর চন্দ্র বলেন, “আমি তাদের গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান দিয়েছি। আল-রিশাদ মুগ্ধ ফেল করার মতো শিক্ষার্থী নয়। হয়তো কোথাও কোনো সমস্যা হয়েছে।”
ধর্মপুর এসআইডি ভোকেশনাল অ্যান্ড কারিগরি কলেজের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট মোছা. মনজুয়ারা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি শুনে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেন বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। তবে শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র বা ওএমআর শিটে কোনো ধরনের কারসাজি হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”