যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসার প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যে চরম উদ্বেগের মুখে রয়েছে ইরান। মার্কিন ও মিত্রদের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তেহরান দীর্ঘদিন ধরে ছায়া ট্যাংকার বহর, শেল কোম্পানি এবং বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার মতো নানা জটিল পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড গত রবিবার জানিয়েছে, তাদের নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে ৭০টি বাণিজ্যিক জাহাজ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, ৩টি অকার্যকর করা হয়েছে এবং দুটিতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তবে ইরানের বিশাল স্থল সীমান্ত, রেললাইন এবং উত্তর দিকে কাস্পিয়ান সাগরের প্রবেশাধিকার তেহরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে কিছুটা সুবিধা দিয়েছে। জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ ভিজিটিং ফেলো এবং জ্বালানি কৌশলবিদ উমুদ শোকরি বলেছেন, চাপের মুখে টিকে থাকার উপায় ইরান বেশ ভালোভাবেই শিখেছে। তবে তিনি আরও বলেন, টিকে থাকা মানেই অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানো নয়। সোমবার তেহরানের খোলা বাজারে ইরানি রিয়ালের পতন ঘটে এবং প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে মুদ্রার হার ২০ লাখ ৩০ হাজারে গিয়ে ঠেকে, যা সর্বকালের সর্বনিম্ন। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন কমছে, ঠিক তখনই ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রতিহত করতে আরও আক্রমণাত্মক মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব মোহসেন রেজাই গত রবিবার এক সতর্কবার্তায় বলেছেন, নতুন মার্কিন অর্থনৈতিক পদক্ষেপে কোনো দেশ সমর্থন দিলে তাদের তেহরানের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালী বা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হবে না। মোহসেন রেজাইকে রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের বা আইআরজিসির কট্টরপন্থী অংশের লোক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যারা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কার্যালয়ের চারপাশে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। সেনাপ্রধান আমির হাতামি সোমবার একদল কমান্ডারের সামনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, প্রয়োজনে তাদের বাহিনী ১০ থেকে ২০ প্রজন্ম ধরে লড়াই করতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, একমাত্র পথ হলো শক্তির ভাষার মাধ্যমে তাদের বোঝানো যে তারা ইরান ও হরমুজ প্রণালীতে যা করতে চায় তা পারবে না। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সোমবার ইরানের অর্থনীতির ওপর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ঘোষণা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য ইরানি অর্থনীতিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং সরকারকে ধসিয়ে দেওয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছে এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে স্থানীয় মুদ্রা, বার্টার ব্যবস্থা ও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাগুলো ইরানের তেলের আয় থেকে হওয়া ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারেনি, যার ফলে বারবার অভ্যন্তরীণ ধাক্কা আসছে। শোকরি জানান, ইরানি তেলের বিশাল চাহিদার কারণে চীনই এখন তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার বলেছে যে নিষেধাজ্ঞা এবং চাপ দ্বন্দ্ব সমাধানের চেয়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে দাবি করেছেন যে ইরান সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকাল থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের প্রচারণা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই মূলত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।