স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নির্যাতিত বীরাঙ্গনাদের একটি পূর্ণাঙ্গ, সর্বজনগ্রাহ্য ও নির্ভুল জাতীয় তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। এই ঐতিহাসিক শূন্যতার অবসান ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তথ্যনির্ভর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বিশেষ কৌশল ও করণীয় নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতিকে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক দায় ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণায় শহীদের সংখ্যা নিয়ে স্পষ্ট মতভেদ ও তারতম্য পরিলক্ষিত হয়েছে যা তথ্যের ব্যাপক ব্যবধানকে ফুটিয়ে তোলে। ইতঃপূর্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় নথিপত্র ও গবেষণায় সরাসরি প্রাপ্ত শহীদের সংখ্যা ৪৬,১৩৫, ধারণাগত বা অনুমাননির্ভর শহীদের সংখ্যা ২,১৩,০৪৩ এবং বিভিন্ন তালিকায় প্রাপ্ত শহীদের সংখ্যা ৩০,৭৫৫। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের দাবি ছিল, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ, যা সুনির্দিষ্ট তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই বিশেষ উদ্যোগে দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষক, শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ, সামরিক ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। গত বুধবার অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় বিশিষ্টজনরা একমত হয়েছেন যে, অনুমান বা বিচ্ছিন্ন উপাত্তের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক নথি, সামরিক রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের সাক্ষ্য ও অভিজ্ঞতার তথ্য বিলম্ব না করে দ্রুত রেকর্ড ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সংবেদনশীল উদ্যোগকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে মাঠপর্যায়ে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে তথ্য সংগ্রহের কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদ, গবেষক ও আর্কাইভ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা জরুরি এবং শহীদদের তথ্য ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের পর সুনির্দিষ্ট মেয়াদে উন্মুক্ত সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সবার সহযোগিতায় সরকারের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ সফল হবে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।