আন্দোলন বা অভ্যুত্থানে দেশের জনসাধারণ অফুরান সংখ্যায় শরিক হইলে তাহার সৃষ্টিশীলতাও অশেষ হয়। বাংলাদেশের জুলাই-আগস্ট ২০২৪ গণ-অভ্যুত্থানও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না। জুলাই ও আগস্টের উত্তাল দিনে শহরের দেয়ালে দেয়ালে অজস্র লিপি ও ছবির উৎসারে ফুটে উঠিয়াছিল ৩৬ জুলাই। কোটি মানুষের কল্পনা এই তারিখটির সৃষ্টি সম্ভব করিয়াছিল এবং রক্তের আখরে মানুষই তাহা লিখিয়াছিল।
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর বলিভিয়ার লা হিগেরা গ্রামে ঝোপঝাড়ের আড়ালে একটি ক্যাম্পে গেরিলার দল ঘেরাও হয়। সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ধরা পড়েন কিউবা বিপ্লবের অন্যতম নায়ক এর্নেস্তো চে গেভারা। বন্দী হওয়ার পর লা হিগেরার এক স্কুলঘরের বারান্দায় যুদ্ধাহত চে’র সঙ্গে কর্নেল আন্দ্রেস সেলিচের পৌনে এক ঘণ্টা কথাবার্তা হয়। ঘটনার ২৯ বছর পর ১৯৯৬ সালে কর্নেল সেলিচের বিধবা মার্কিন সাংবাদিক জন লি অ্যান্ডারসনকে সেই কথাবার্তার একটি লিখিত ভাষ্য পড়ার সুযোগ দেন।
কর্নেল সেলিচের সেই জবানবন্দীতে চে গেভারা বলেছিলেন যে তিনি বিফল হইয়াছেন এবং সর্বনাশ ঘটিয়াছে। বলিভিয়ার চাষাভূষা মানুষের বন্যদশার কাছাকাছি গরিবির অবস্থার কথা উল্লেখ করিয়া তিনি সেখানে তৎপরতা চালাইবার কারণ ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। সিআইএ’র সপ্রাণ ধরার মতলব থাকিলেও ৯ অক্টোবর ঠান্ডা মাথায় চে গেভারাকে খুন করা হয়। প্রথমে হাতে ও পায়ে এবং পরে বুকে বুলেট চালাইয়া তাঁহাকে হত্যা করা হয় এবং ভাইয়েগ্রান্দে বিমানবন্দরে অজ্ঞাতস্থানে দেহ পুঁতিয়া ফেলা হয়।
মানুষ নায়ক হইয়া জন্মায় না, হইয়া ওঠে এবং শক্তির অপর নাম যে জনগণ, তাহা জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে প্রমাণিত হইয়াছে। শত শত মানুষ হত, আহত ও নির্যাতিত হইলেও পথ হারান নাই এবং মৃত্যুভয় জয় করিয়াছেন। এই মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের কাফেলাই আমাদের কালের নায়ক হইয়া উঠিয়াছে। দীর্ঘ জুলাইয়ের প্রাণদানের সঙ্গে চে গেভারার প্রাণদানের এক গভীর মেলবন্ধন আজও অনুভূত হয়।