বন্ধ করুন
বরিশালে স্কুল ফিডিংয়ে পচা কলা-বাসি ডিম
ডিজাইন:
100%
ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ
দৈনিক পত্রিকা


দৈনিক পত্রিকা ২৯ আগস্ট ২০২৬ ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ

ইপেপার সংস্করণ ২৯ আগস্ট ২০২৬ দৈনিক পত্রিকা

Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ


বরিশালে স্কুল ফিডিংয়ে পচা কলা-বাসি ডিম


মোঃ মেহেদী হাসান
মোঃ মেহেদী হাসান প্রধান প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট:
বরিশালে স্কুল ফিডিংয়ে পচা কলা-বাসি ডিম
বরিশালে স্কুল ফিডিংয়ে পচা কলা-বাসি ডিম
Featured Image বরিশাল বিভাগের আট উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের টিফিনে পুষ্টিকর খাবার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন রুটি, বিস্কুট, ডিম, কলা ও দুধের মধ্যে অন্তত দুটি খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও নিয়মিত তা দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও দেওয়া হচ্ছে কাঁচা বা অতিরিক্ত পাকা কলা, আবার কোথাও আগের দিন সিদ্ধ করা ডিম। নিম্নমানের খাবার খেতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী তা ফেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। শুধু খাবারের মান নয়, সরবরাহের সময় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে দুপুর ২টার পর খাবার পৌঁছানোয় প্রথম শিফটের শিক্ষার্থীরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে এক দিন খাবার সরবরাহের পর পরদিন সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৭ নভেম্বর থেকে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচি’র কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির আওতায় বরিশাল বিভাগের আটটি উপজেলা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কখনো কাঁচা আবার কখনো অতিরিক্ত পাকা কলা দেওয়া হয়। ডিম আগের দিন সিদ্ধ করে রাখারও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের খাবার শিশুরা খেতে চায় না। অনেক সময় দুপুর ২টার পর খাবার সরবরাহ করা হয়। ফলে প্রথম শিফটে থাকা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ খাবার না পেয়েই বাড়ি ফিরে যায়। কর্মসূচির আওতাভুক্ত বিদ্যালয়গুলোতে এখনো দুধ ও বিস্কুট সরবরাহ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে রুটি ও দুধ এবং সার্টিফায়েড বিস্কুট ও কলা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে এসবের পরিবর্তে শুধু রুটি ও কলা দেওয়া হচ্ছে। বানারীপাড়া উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা খাবারের মান ও সরবরাহ নিয়ে সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বানারীপাড়া উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও নাগটুয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুল ইসলাম বলেন, সরবরাহ করা রুটি ও কলার মান ঠিক থাকে না। এমনকি বিষ্ঠাযুক্ত ডিমও সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। উপজেলার ১২৬টি বিদ্যালয়েই কমবেশি একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে তাঁর দাবি। মনিরুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় রাত ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছায়। সেই খাবার পরদিন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। আবার দুপুর ২টার পর খাবার পৌঁছানোও নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই উপজেলার মরিচবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে মঙ্গলবার রুটি ও কলা সরবরাহ করা হয়েছিল। তাঁদের জানানো হয়েছিল, বুধবার খাবার সরবরাহ করা হবে না। প্রতি প্যাকেটে ৬০ গ্রাম ওজনের দুটি রুটি থাকার কথা থাকলেও মঙ্গলবার সব শিক্ষার্থীকে একটি করে রুটি দেওয়া হয়। অবশিষ্ট রুটি ও কলা বুধবার বিতরণ করা হয়েছে। বানারীপাড়া সরকারি বন্দর মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে, তাদের কাঁচা কলা ও পচা ডিম দেওয়া হয়েছে। বানারীপাড়ায় বিদ্যালয়গুলোতে খাদ্য সরবরাহের দায়িত্বে থাকা এজেন্ট কাজী কামাল। তাঁর ভাই কাজী তরিকুল এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তরিকুল বলেন, তাঁদের সরবরাহ তালিকায় দুধ ও বিস্কুট নেই। তাই এ দুটি খাবার তাঁরা দেন না। তবে আগের দিন ডিম সিদ্ধ করে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। বাকেরগঞ্জ পৌর শহরের সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফিজা আক্তার জানায়, তাদের পচা কলা ও আগের দিন সিদ্ধ করা ডিম দেওয়া হয়। এসব খাবার খেতে না পেরে তারা ফেলে দেয়। বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের বিরঙ্গন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে এক ধরনের খাবার দেওয়া হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় থেকে চলে যাওয়ার পর ঠিকাদারের লোকজন খাবার নিয়ে পৌঁছান। এতে খাবারের অপচয় হয়। বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে ছয়টি পয়েন্ট থেকে খাবার সরবরাহ করা হয়। একবার গাড়ি দুর্ঘটনার কারণে টানা তিন দিন খাবার সরবরাহ বন্ধ ছিল। শিশুদের উপযোগী মানসম্মত খাবার দিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি পারছে না বলেও তিনি স্বীকার করেন। অভিযোগের বিষয়ে আইল্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহদাত হোসেন বলেন, প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। কিছু অনিয়মের খবর তিনিও পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিতরণকারীরা দায়ী। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সরবরাহের জন্য মোট ২০টি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে আটটি প্যাকেজের দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১২টি প্যাকেজে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। শাহদাত হোসেন বলেন, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনে তাঁদের পরিবর্তে অন্যদের দায়িত্ব দেওয়া হবে।

দুধ ও বিস্কুট সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, এ দুটি খাবার সরবরাহের দরপত্র পেয়েছে প্রাণ কোম্পানি। আগামী জানুয়ারি থেকে তারা বিতরণ শুরু করবে। তবে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পেছনে বিভিন্ন উপজেলার স্থানীয় রাজনীতিও কাজ করছে বলে দাবি করেন আইল্যান্ড ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সূত্র জানায়, বরিশাল বিভাগের ২০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক দুটি প্যাকেজ করা হয়েছে। বরিশাল-১ প্যাকেজের আওতায় রয়েছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ, বানারীপাড়া, গৌরনদী, হিজলা, মুলাদী ও উজিরপুর এবং ঝালকাঠির কাঠালিয়া ও নলছিটি উপজেলা। আর বরিশাল-২ প্যাকেজের আওতায় পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলার ১২টি উপজেলা রয়েছে। এ প্যাকেজটি বর্তমানে পুনঃদরপত্রের পর্যায়ে রয়েছে। বরিশাল-১ প্যাকেজে দরপত্রের মাধ্যমে এক বছরের কার্যাদেশ পেয়েছে আইল্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি। এ কার্যাদেশের মূল্য ৬৫ কোটি ৬১ লাখ ৩৫ হাজার ৯২১ টাকা। শর্ত অনুযায়ী, আট উপজেলার ১ হাজার ২৪৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৫১ শিক্ষার্থীকে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করার কথা প্রতিষ্ঠানটির। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৯০ শতাংশ উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে খাবার সরবরাহের নির্দেশনা রয়েছে। তবে আইল্যান্ড ট্রেডিং স্থানীয়ভাবে একাধিক এজেন্ট ও সাব-এজেন্ট নিয়োগ করে বিদ্যালয়গুলোতে খাবার সরবরাহ করছে। আর এ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বরিশালের বানারীপাড়া, বাকেরগঞ্জ ও হিজলা উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।