বন্ধ করুন
রাশিয়ায় কাজে গিয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি সুন্দরগঞ্জের রিমেল মিয়া
ডিজাইন:
100%
ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ
দৈনিক পত্রিকা


দৈনিক পত্রিকা ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ

ইপেপার সংস্করণ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ দৈনিক পত্রিকা

Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ


রাশিয়ায় কাজে গিয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি সুন্দরগঞ্জের রিমেল মিয়া


মোঃ মেহেদী হাসান
মোঃ মেহেদী হাসান প্রধান প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট:
রাশিয়ায় কাজে গিয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি সুন্দরগঞ্জের রিমেল মিয়া
রাশিয়ায় কাজে গিয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি সুন্দরগঞ্জের রিমেল মিয়া
Featured Image

ভালো বেতনের চাকরির স্বপ্নে প্রায় ছয় লাখ টাকা ধারদেনা করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার যুবক রিমেল মিয়া। পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচানো আর ঋণের বোঝা কমানোর আশায় ২০২৫ সালের মার্চে নির্মাণশ্রমিকের কাজ নিয়ে দেশ ছাড়েন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন অল্প সময়েই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। কাজ হারিয়ে আইনি জটিলতায় পড়ে শেষ পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণের পর তাকে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। পরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে যুদ্ধবন্দি হন তিনি। দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে তার কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবার তাকে মৃত ভেবেই দিন কাটাচ্ছিল। সম্প্রতি ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টার থেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার জীবিত থাকার খবর প্রকাশ্যে আসে।

রিমেল মিয়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটী ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের সৈয়দ আলী ও রেখা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় ছেলে।

সরেজমিনে রিমেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি ছোট ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারটি। অভাব-অনটন যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। সংসারের একমাত্র ভরসা ছিলেন রিমেল। তার উপার্জনের আশাতেই ধারদেনা করে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন বাবা-মা।

রিমেল মিয়া সৈয়দ আলী ও রেখা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় ছেলে। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বড় ভাই এরশাদ আলী ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করেন। তৃতীয় ভাই রুবেল মিয়া সৌদি আরবে কর্মরত এবং ছোট ভাই সোহেল মিয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, রিমেল স্থানীয় শোভাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুটি বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পর বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতির কারণে আর পরীক্ষা সম্পন্ন করেননি। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতেই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সম্প্রতি ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টার থেকে জুমের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিমেল বলেন, 'আমার পরিবার জানে না আমি কোথায় আছি, আমি বেঁচে আছি নাকি মারা গেছি। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অন্তত তারা জানতে পারবে আমি এখনো বেঁচে আছি।'

রিমেলের বাবা সৈয়দ আলী স্থানীয় শোভাগঞ্জ বাজারে একটি ছোট পানের দোকান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালান। তিনি বলেন, 'ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশ পাঠাই। রাশিয়া যাওয়ার পর পাঁচ-ছয় মাস আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এরপর প্রায় ১১ মাস ধরে তার কোনো খোঁজ পাইনি। সে কেমন আছে, বেঁচে আছে কি না কিছুই জানতাম না। পত্রিকায় দেখে জানতে পারলাম আমার ছেলে জীবিত আছে। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।'

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিমেলের মা রেখা বেগম বলেন, 'ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে প্রতিদিন আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দোয়া করেছি। মনে হতো হয়তো আর কোনো দিন আমার ছেলেকে দেখতে পাব না। এখন জানতে পেরেছি সে বেঁচে আছে। আমি শুধু আমার ছেলেকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই। সরকার যেন আমার ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনে।'

স্থানীয় আলম মিয়া বলেন, 'রিমেলের ঘটনা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। কাজের আশায় বিদেশে গিয়ে সে যুদ্ধবন্দি হয়েছে। সরকার কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনুক। একই সঙ্গে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।'

রিমেল জানান, রাশিয়ায় গিয়ে প্রথমে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে মাসে ৭০০ ডলার বেতনে কাজ শুরু করেন। পরে কাজ হারিয়ে বৈধভাবে থাকার উপায় খুঁজতে গিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিপত্রটি রুশ ভাষায় হওয়ায় তিনি সেটির কিছুই বুঝতে পারেননি। উচ্চ বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণের পর তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় এক মাস একটি বাঙ্কারে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের তথ্য অনুযায়ী, কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় যাওয়া অনেক বাংলাদেশি পরে বিভিন্নভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন, আবার কেউ যুদ্ধবন্দি হয়েছেন।

বর্তমানে ইউক্রেনের ডিটেনশন সেন্টারে থাকা রিমেলসহ তিন বাংলাদেশি যুদ্ধবন্দিই বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগে নিরাপদে দেশে ফিরতে চান। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছেন, রাশিয়ায় তাদের নামে জমা থাকা বেতন ও পাওনা অর্থও যেন যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়।