বিদ্যুৎ বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। তবে সরকারের এই আলোচনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দায়িত্ব বদলালেই বিদ্যুৎ খাতে অব্যবস্থাপনার সমাধান মিলবে, নাকি গ্রাহকের বিল ও ভোগান্তি বাড়বে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিলে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়তে পারে। গত ১৫ বছরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও নীতিগত দুর্বলতার কারণে লোডশেডিং কমেনি। এক্ষেত্রে বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে না দিয়ে বরং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমানে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করায় ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের টাকায় পরিশোধ হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া বিলের চাপ। বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছেন, “লাভক্ষতির হিসাব মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে। ভর্তুকি যেটা দিচ্ছি, সেটাও সাধারণ মানুষের টাকা, আবার বিদ্যুতের দাম বাড়লে সেটাও দিচ্ছে ওই গ্রাহকই, দুই জায়গায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। এই পরিস্থিতি ঠিক করতেই সরকার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের চিত্র ছিল মূলত অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প আর আমদানি নির্ভরতার এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। কুইক রেন্টালের নামে যত্রতত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং অলস বসিয়ে রেখে হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধের সংস্কৃতি পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, “দেশের জ্বালানি খাতে ভয়াবহ জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে। যা উত্তরণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ জরুরি।” তার মতে, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ঠিক না করে বেসরকারিকরণে বরং গ্রাহকের ব্যয় আরও বাড়বে, যেমনটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত উপাদান বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হচ্ছে, যা রেগুলেটরি সিস্টেমকে ধ্বংস করেছে বলে অধ্যাপক শামসুল আলম মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “এখন পুরো সেক্টর পুনর্গঠন না করে যদি বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে বড়ো ধরনের সর্বনাশ হবে। এর ফলে সরকারও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে।”
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বেসরকারিকরণের কিছু সুফলও রয়েছে। তাদের মতে, বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে সরকারি দীর্ঘসূত্রিতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমতে পারে, পাশাপাশি সিস্টেম লস ও বকেয়া আদায় দ্রুত হতে পারে। যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্কের সফল মডেলের উদাহরণ টেনে তারা শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর রেগুলেটরের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরী ডেসকো ও পিজিসিবির আংশিক বেসরকারিকরণের ফলাফল নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “ব্যাংকে লুটপাটের পর আমানতকারীর টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হচ্ছে, বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।”
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বেসরকারি কোম্পানির মূল লক্ষ্য মুনাফা হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। এছাড়া, পাহাড়ি, দুর্গম বা কম জনবহুল এলাকায় বিদ্যুৎ দিতে বেসরকারি কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী নাও হতে পারে, যা বৈষম্য তৈরি করবে।
শ্রমিক অসন্তোষ এবং কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাত জিম্মি হওয়ার সুযোগ তৈরির শঙ্কাও রয়েছে। অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর করলে রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কমবে না। আগে চুক্তিগুলো রিভাইস করা দরকার। নীতিগত দুর্বলতা দূর না করে শুধু বিতরণ বেসরকারি খাতে দিলে লাভ হবে না।”
সরকার বলছে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) যে দামে বিদ্যুৎ কেনে, তার চেয়ে কম দামে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে বিক্রি করে, যার লোকসান ভর্তুকির মাধ্যমে পুষিয়ে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বিদ্যুৎ খাতে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া বিলের দায় নিয়েই বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।
মন্ত্রী আরও জানান, “ডিস্ট্রিবিউশনটা আমরা প্রাইভেট করতে চাই এবং প্রাইম মিনিস্টার হ্যাজ গিভেন মি কনসেন্ট, ইউ গো অ্যাহেড।” তার মতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিলে দক্ষতা বাড়বে, বিল আদায় নিশ্চিত হবে এবং সরকারের ভর্তুকির বোঝা কমবে। ভারতের মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানি এবং কলকাতায় গোয়েঙ্কারা সফলভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ চালাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিদ্যুৎ বিল আরও বাড়বে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “বিদ্যুৎ বিল তো এমনিতেই বাড়াতে হবে, আমরা ১৭ টাকায় কিনে আট টাকায় বিক্রি করছি—সরকার আর কত ভর্তুকি দিতে পারবে?” তিনি মনে করেন, বিদ্যুতের সরবরাহ, চুরি ঠেকানো এবং বিল আদায় কার্যক্রমে বেসরকারি খাত ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে, কারণ সরকারি উদ্যোগে খুব একটা লাভ হয়নি।