বন্ধ করুন
কাঁধে বই, হাতে বাদামের ঝোলা ছোট্ট মাহিমের ওপর পুরো সংসার।
ডিজাইন:
100%
ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ
দৈনিক পত্রিকা


দৈনিক পত্রিকা ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ

ইপেপার সংস্করণ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ দৈনিক পত্রিকা

Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ


কাঁধে বই, হাতে বাদামের ঝোলা ছোট্ট মাহিমের ওপর পুরো সংসার।


মহাকল্লোল নিউজ ডেস্ক
মহাকল্লোল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট:
কাঁধে বই, হাতে বাদামের ঝোলা  ছোট্ট মাহিমের ওপর পুরো সংসার।
কাঁধে বই, হাতে বাদামের ঝোলা ছোট্ট মাহিমের ওপর পুরো সংসার।
Featured Image

শ্রেণিকক্ষে বন্ধুদের সঙ্গে লেখাপড়া করছিল দ্বিতীয় শ্রেণির মাহিম। ছুটির ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে সবাই হৈ-হুল্লোর করতে করতে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। এরপর সবাই মাঠে-খেলাধুলায় ব্যস্ত। তবে মাহিম আর বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে নামতে পারল না। সে তার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাদাম বিক্রির উদ্দেশ্যে।

মেহেরপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের গ্যাজাল পাড়ার আব্দুল মান্নানের ছেলে মাহিম। সে ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর ছোট্ট এই শিশুর কাঁধেই এসে পড়েছে সংসারের দায়িত্ব।

মাহিমের স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রায় ২০ বছর আগে পানিতে ডুবে মারা যায় মাহিমের এক ভাই। এরপর প্রায় দেড় বছর আগে স্ট্রোকে মারা যান তার বাবা আব্দুল মান্নান। একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় এখন মা শিল্পী খাতুনকে নিয়েই মাহিমের ছোট্ট সংসার। সংসারের আয় বলতে এখন মাহিমের বাদাম বিক্রির টাকাতেই ভরসা। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাদাম বিক্রি করছে সে। তবু থেমে যায়নি তার পড়াশোনা, ভেঙে পড়েনি স্বপ্নও।

জানা গেছে, প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে মা শিল্পী খাতুন প্রায় ৫০ প্যাকেট বাদাম ভেজে ছেলের জন্য প্রস্তুত করেন। এরপর মাহিম স্কুলের পোশাক পরে খাওয়া-দাওয়া শেষে ছোট্ট সাইকেলে করে বাদামের প্যাকেট নিয়ে স্কুলে যায়। ক্লাস শেষ হওয়ার পর যখন সহপাঠীরা বাড়ি ফিরে খেলাধুলায় মেতে ওঠে, তখন মাহিম বেরিয়ে পড়ে বাদাম বিক্রি করতে।

দিনের বেলা বাদাম বিক্রি শেষে বাড়ি ফিরে সামান্য খাওয়া-দাওয়া করেই আবার বের হতে হয় তাকে। কখনো প্রখর রোদ, কখনো ঝুম বৃষ্টি কোনো প্রতিকূলতাই তাকে থামাতে পারে না। রাত পর্যন্ত চলে তার বাদাম বিক্রি। আর বাড়িতে বসে অপলক চোখে পথ চেয়ে থাকেন মা শিল্পী খাতুন। ছোট্ট সাইকেলে বের হওয়া সন্তান নিরাপদে বাড়ি ফিরবে কি না, এই উৎকণ্ঠা নিয়েই কাটে তার প্রতিটি দিন।

মাহিমের মা শিল্পী খাতুন বলেন, ‘যে বয়সে আমার ছেলে স্কুল শেষে বাড়িতে ফিরে লেখাপড়া করবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করবে, সেই বয়সে তাকে সংসারের জন্য বাদাম বিক্রি করতে হচ্ছে। মা হিসেবে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? কিন্তু অভাবের কারণে আমার কিছুই করার নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা পাইনি। প্রতিদিন মাহিম বাদাম বিক্রি করে। আবার মেহেরপুর শহর থেকে বাদাম কিনে বাড়িতে নিয়ে আসে। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তাকে ঘুরতে হয়। কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ায় বৃষ্টিতে ভিজে বাদাম বিক্রি করতে গিয়ে এখন সে এখন জ্বরে পড়েছে। তারপরও সংসারের প্রয়োজন তাকে আবার বাদাম বিক্রি করতে বের হতে বাধ্য করছে।’

স্থানীয়রা জানান, প্রায় প্রতিদিনই মাহিমকে সাইকেলে করে বাদাম বিক্রি করতে দেখা যায়। তার সংগ্রামী জীবন এলাকার মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তারা সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের এই শিশুর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাহিমের জন্য প্রয়োজনীয় বই, খাতা ও কলমের ব্যবস্থা করেছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় থেকে তাকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যাতে অভাবের কারণে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে না যায়।’

মেহেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘আগামী আগস্ট মাসের শেষ দিকে মাহিমের মায়ের জন্য বিধবা ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ইউনিসেফের আওতায় ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশু হিসেবে মাহিমকে শিক্ষাবৃত্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া সমাজসেবা কার্যালয়ের আওতায় সম্ভাব্য অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও পরিবারটিকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’

জীবনের নির্মম বাস্তবতা মাহিমের শৈশবকে অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে। তবু সে স্কুল ছাড়েনি, স্বপ্ন দেখাও থামায়নি। এক হাতে বই-খাতা, অন্য হাতে বাদামের প্যাকেট, এই দুইয়ের মাঝেই এগিয়ে চলছে তার জীবনযুদ্ধ।