বন্ধ করুন
মোদী সরকারের বড় পরীক্ষা: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ও ভারতের সমসাময়িক ছাত্র বিদ্রোহ!
ডিজাইন:
100%
ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ
দৈনিক পত্রিকা


দৈনিক পত্রিকা ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইপেপার সংস্করণ
Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ

ইপেপার সংস্করণ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ দৈনিক পত্রিকা

Mahakallol News | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ


মোদী সরকারের বড় পরীক্ষা: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ও ভারতের সমসাময়িক ছাত্র বিদ্রোহ!


মোঃ মেহেদী হাসান
মোঃ মেহেদী হাসান প্রধান প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট:
মোদী সরকারের বড় পরীক্ষা: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ও ভারতের সমসাময়িক ছাত্র বিদ্রোহ!
মোদী সরকারের বড় পরীক্ষা: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ও ভারতের সমসাময়িক ছাত্র বিদ্রোহ!
Featured Image

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার নীতিগত পতন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের বিরুদ্ধে রাজধানী নয়াদিল্লির যান্তর মন্তর এখন এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংগ্রামের ভরকেন্দ্র। ২০২৬ সালের মে মাসে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি কেবল একটি ছাত্র বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বর্তমানে মোদী সরকারের তৃতীয় মেয়াদের জন্য সবচেয়ে বড় শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

১. অপমান থেকে রাজনৈতিক স্ফুলিঙ্গ: ‘ককরোচ’ রূপক

২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের সর্বোচ্চ মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (NEET-UG) এবং নেট (NET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি সামনে আসার পর দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম হয়। এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের শুনানির সময় এক বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্য। তিনি বেকার যুবসমাজ ও প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদকারীদের পরোক্ষভাবে "সমাজ ধ্বংসকারী তেলাপোকা ও পরজীবী" (Cockroaches and Parasites) বলে অভিহিত করেন।

আদালত পরবর্তীতে ব্যাখ্যা দেয় যে মন্তব্যটি জাল সার্টিফিকেটধারীদের উদ্দেশ্য করে ছিল, কিন্তু ততক্ষণে তরুণদের আত্মসম্মানে আঘাত লেগে গেছে। এই অপমানকে প্রতিবাদের ব্র্যান্ডিংয়ে রূপ দেন আম আদমি পার্টির (AAP) সাবেক সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলবিদ এবং বোস্টন ইউনিভার্সিটি ফেরত ৩০ বছর বয়সী তরুণ অভিজিৎ দীপকে। ১৬ মে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন, যার নাম দেওয়া হয় ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা হয়ে ওঠে টিকে থাকা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অপরাজেয় প্রতীক।

২. ডিজিটাল শক্তি ও প্রধান বিরোধী শিবিরের মেরুকরণ

অনলাইন থেকে এই আন্দোলনটি খুব দ্রুতই গতি পায়। ইনস্টাগ্রামে এর অনুসারীর সংখ্যা ২৫ মিলিয়ন (আড়াই কোটি) ছাড়িয়ে যায়, যা ভারতের শাসক দল বিজেপির অফিশিয়াল পেজের চেয়েও দ্বিগুণ। ৬ জুন অভিজিৎ দীপকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে সশরীরে আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে নিলে ডিজিটাল মিম আন্দোলনটি রাজপথের গণবিদ্রোহে রূপ নেয়।

এই যুব জাগরণ ভারতের প্রধান বিরোধী দলগুলোর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, অখিলেশ যাদব এবং উদ্ধব ঠাকরের মতো শীর্ষ বিরোধী নেতারা এই আন্দোলনের প্রকাশ্য সমর্থন জানান। এমনকি ২০ জুলাই পার্লামেন্টের বাদল অধিবেশন (Monsoon Session) শুরুর দিন ১০,০০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর সংসদ ভবনের অভিমুখে মিছিলে police টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করলে, বিরোধী দলগুলো পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে একযোগে নরেন্দ্র মোদী সরকারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে এবং সংসদীয় কার্যক্রম স্থবির করে দেয়।

৩. সোনম ওয়াংচুকের অনশন ও সরকারের আপস-রফা

আন্দোলনকে নৈতিকভাবে সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে যান লাদাখের বিখ্যাত শিক্ষা সংস্কারক ও পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির সমর্থনে ২৮ জুন থেকে যান্তর মন্তরে আমরণ অনশন শুরু করেন। ২৩ জুলাই রাতে পুলিশ তাকে জোরপূর্বক অনশনমঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করালে সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় মোদী সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। সরকারের শীর্ষ দুই মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সাথে দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ২৪ জুলাই সরকার আন্দোলনকারীদের তিনটি প্রধান লিখিত আশ্বাস দেয়:

peaceful আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি মামলা করা হবে না।

পার্লামেন্টে পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার এবং প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে বিশেষ ও বিস্তারিত আলোচনা হবে।

NEET প্রশ্ন ফাঁসের পর মানসিক অবসাদে আত্মহননকারী ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনা করা হবে।

এই লিখিত প্রতিশ্রুতির পর সোনম ওয়াংচুক তাঁর ২৬ দিনের দীর্ঘ অনশন ভঙ্গ করেন।

৪. প্রথম ঐতিহাসিক বিজয়: শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা

ককরোচ জনতা পার্টির মূল এবং "অ-আপসযোগ্য" দাবি ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে অবশেষে ২৫ জুলাই ২০২৬ (শনিবার) ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

তিনি সামাজিক মাধ্যমে তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে লিখেছেন, তিনি দেশের যুবসমাজের আবেগ ও সঠিক প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই খবর আসার সাথে সাথেই যান্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের মধ্যে অভূতপূর্ব উল্লাস দেখা যায় এবং এটিকে ভারতীয় যুবশক্তির এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

৫. রাজনৈতিক তাত্পর্য এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ সত্ত্বেও ককরোচ জনতা পার্টি যান্তর মন্তর ছাড়ছে না। CJP প্রধান অভিজিৎ দীপকে এবং সৌরভ দাস স্পষ্ট জানিয়েছেন, মন্ত্রীর অপসারণ কেবল প্রথম ধাপ। তাদের মূল লড়াই ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে জেঁকে বসা দুর্নীতি দূর করা, পরীক্ষার্থীদের জন্য "শিক্ষার্থী অধিকার সনদ" (Students' Rights Charter) বাস্তবায়ন এবং দোষীদের ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।

আরএসএস (RSS) প্রধান মোহন ভাগবতও এই আবহে মন্তব্য করেছেন যে তরুণদের বুঝতে গেলে তাদের নির্দেশ না দিয়ে আলোচনা করা জরুরি। এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, ভারতের 'জেন-জি' (Gen Z) প্রজন্ম কোনো সুনির্দিষ্ট political আদর্শ বা এজেন্ডা ছাড়াই কেবল শাসনতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং নিজেদের কর্মসংস্থানের দাবিতে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কাঁপিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।