২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই এই পরিবর্তন নিয়ে গুঞ্জন চলছিল। সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়া এবং বঙ্গভবনে বিদায়ের প্রস্তুতি নেওয়ার খবরের পর এই আলোচনা এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।যেহেতু বর্তমান সংসদ অনুযায়ী ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই তাদের মনোনীত প্রার্থীই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন তা নিশ্চিত। এই দৌড়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট ও শীর্ষ আমলাদের নাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে শীর্ষ contenders
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক অলিন্দ এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মূলত দুটি ধারা থেকে নাম উঠে আসছে—প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক।
১. প্রশাসনিক বা আমলাতান্ত্রিক ধারা (শীর্ষ পছন্দ)
রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে চমকপ্রদ যে আলোচনাটি চলছে, তা হলো কোনো জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার বদলে একজন অভিজ্ঞ আমলাকে বঙ্গভবনের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি: রাষ্ট্রপতির দৌড়ে বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নামগুলোর মধ্যে অন্যতম হলেন বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা এবং গভীর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত সচিবগণ: নাসিমুল গনি ছাড়াও বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত আরও কয়েকজন সিনিয়র সচিবের নাম নীতিগত আলোচনায় রয়েছে। আগামী সাধারণ নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে এই অভিজ্ঞ আমলাদের বিবেচনা করা হচ্ছে।
২. রাজনৈতিক ধারা (বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ)
শুরুতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের নাম এই পদের জন্য জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছিল। যদিও তারা এই বিষয়ে গণমাধ্যমে সরাসরি মুখ খোলেননি, তবুও দলের ভেতরে নিম্নলিখিত নামগুলো নিয়ে বিস্তর চর্চা রয়েছে:
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন: বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই প্রবীণ সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিবেচনায় রয়েছেন।
ড. আবদুল মঈন খান: দলের অন্যতম নীতি নির্ধারক ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত মঈন খানের নামও রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় প্রথম সারিতে রয়েছে।
বেগম সেলিমা রহমান: বিএনপির নারী নেতৃত্বের শীর্ষপর্যায়ের এই নেত্রীর নামও বিভিন্ন স্তরের আলোচনায় উঠে এসেছে।
কেন আমলা বা নিরপেক্ষ মুখ বেছে নেওয়া হতে পারে?
বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও সরাসরি দলীয় নেতার পরিবর্তে একজন পেশাদার আমলাকে রাষ্ট্রপতি করার পেছনে মূলত তিনটি কৌশলগত কারণ রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন:
┌────────────────────────────────────────────────────────┐ │ পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ের মূল মাপকাঠি │ └───────────────────────────┬────────────────────────────┘ │ ┌───────────────────┼───────────────────┐ ▼ ▼ ▼ ┌───────────────┐ ┌───────────────┐ ┌───────────────┐ │ রাজনৈতিক │ │ প্রশাসনিক │ │ সব মহলে │ │ চাপ সামলানো │ │ দক্ষতা ও আস্থা│ │ গ্রহণযোগ্যতা │ └───────────────┘ └───────────────┘ └───────────────┘
প্রশাসনিক ভারসাম্য: সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীর হাতে মূল নির্বাহী ক্ষমতা থাকে। তাই রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ আমলাকে বসিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের গতিশীলতা রক্ষা করাকে বেশি কার্যকর মনে করছে নতুন সরকার।
রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা: পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই অনুষ্ঠিত হবে। যেকোনো রাজনৈতিক সংকট বা চাপ দৃঢ়তার সঙ্গে সামলানোর সক্ষমতা যাচাই করেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা: জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ও সব মহলে গ্রহণযোগ্য একটি অবয়ব বজায় রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কী?
বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:
স্পিকারের কাছে পদত্যাগ: সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বহস্তে লেখা চিঠির মাধ্যমে পদত্যাগ করতে হবে।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব: পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সাথে সাথেই তা কার্যকর হবে এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন: সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদটি শূন্য হওয়ার সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের আগামী রাষ্ট্রপ্রধান কে হচ্ছেন—তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সমীকরণে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির দিকেই পাল্লা সবচেয়ে বেশি ভারী দেখা যাচ্ছে।